Header Ads Widget

সবই মায়ের লীলা || প্রবীর মজুমদার

'ঠাকুরমশয় সর্বনাশ হইছে!'
সকাল হতে না হতেই পরিত্রাহি চিৎকার শুনে মনোহর কাপালিকের ঘুম ভাঙল। দরজা খুলে চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে এলেন তিনি। উঠোনে এক মুনিষ গোছের লোক উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
মনোহর কাপালিক বললেন, 'আরে হরেন যে!  সাত সকালে কী মনে করে? বলি ডাকাত পড়েছে না কি?' কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিরক্তি গোপন করলেন না মনহর কাপালিক।
হরেন  বলল, 'ডাকাইত পড়ার থিক্যাও খারাপ খবর। কারা য্যান মন্দিরের ঠাকুর ভাইঙ্যা রাইখ্যা গেছে।'
'বলিস কি রে?' চমকে উঠলেন কাপালিকমশাই।
'হ্যাঁ গো ঠাকুর! এই মাত্তর দেইখ্যা আইলাম। কালিখোলার মন্দির লণ্ডভণ্ড হইয়া গেছে গা।'
'একি সব্বনেশে কাণ্ডরে বাবা! শেষ কালে আমাদের পাড়াতেও শুরু হল!' রক্তবরণ চাদর খানা গায়ে জড়িয়ে মনোহর কাপালিক বিরস বদনে বললেন, 'চল তো দেখে আসি।'
কালিখোলার বুড়ো বটগাছের নীচে জীর্ন এক কালি মন্দির। মন্দিরটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কোনও এক জমিদার। এখন গ্রামবাসীরা সম্মিলিতভাবে মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষন করে। পূজার্চনার দায়িত্ব মনহর কাপালিকের উপর। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, মনোহর কাপালিক অন্য কাপালিকের মত শ্মসানবাসী নন। শোনা যায়, শ্মসানে কোনও এক সময় না কি থাকতেন তিনি। সাধনায় সিদ্ধিলাভের পর আর শ্মসানে থাকার দরকারটা কী? তাই তিনি এখন লোকালয়ে বসবাস করে যজমানি পেশায় মন দিয়েছেন।
মন্দিরে পৌঁছে দেখা গেল গ্রামের আরো অনেকে এসে জড়ো হয়েছে। মন্দিরের দরজা হাট করে খোলা। দরজার আংটার সঙ্গে ঝুলছে ভাঙা তালাখানা। উপস্থিত গ্রামবাসীরা কাপালিককে ছেঁকে ধরল।
রতন সামন্ত বলল, 'দেখুন দেখি ঠাকুরমশাই, একে একে তো সবই গেছে। এবার কী ঠাকুর দেবতা ছেড়ে আল্লাহু আকবর করতে হবে?'
'চুপ চুপ কেউ হুইন্যা হ্যালাইব।' বলে করালীমোহন রতনের মুখ চেপে ধরে।
রতন সামন্তের বয়স কম। টগবগে রক্ত। পরিণাম নিয়ে অত চিন্তা নেই তার। তাই দাদা-স্থানীয় করালীমোহনকে রতনের উপর সাজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়।
মনোহর কাপালিক মন্দিরে ঢুকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। একে তে আলো কম, তার উপর দৃষ্টির জোরও কমে গেছে বয়সের প্রতিক্রিয়ায়। দেশলাই জ্বেলে সরষের তেলের বাতিটায় অগ্নিসংযোগ করলেন কাপালিকমশাই। বাতির মৃদু আলোয় যা দেখলেন তাতে গা শিউরে উঠল তাঁর। মুণ্ডমালিনীর মুণ্ডু মেঝেতে গড়াগড়ি যাচ্ছে। ভেঙে ঝুলে পড়েছে চার হাতের তিনটে হাতই। আর সহ্য করতে পারলেন না কাপালিক। 'উফ কী বিভৎস' বলে মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি।
রতন বলল, 'ব্যাটারা আজ ঠাকুর ভেঙেছে। কাল যে আমাদের ঘরে আগুন দেবে না, কিংবা আমাদের বাড়ির জরু বা গরুর দিকে হাত বাড়াবে না তার কোনও ঠিক আছে?'
করালীমোহন বলল, 'ঠাকুরমশাই, আপনে তো তান্ত্রিক। মারণ উচাটন কত কিছু জানা আছে আপনের। জোরদার মন্তর ছাইড়্যা দ্যান না ব্যাডাগো শায়েস্তা কইর‍্যা।’
মারণ উচাটনের কথা শুনে মনে মনে প্রমাদ গোনেন মনোহর কাপালিক। গ্রামবাসীদের তাঁবে রাখার জন্যে মাঝে মাঝেই তিনি মারণ উচাচনের গল্প করেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ঐ বিদ্যেটার প্রমাণ দেবার সাহস করেননি কোনও দিন। বস্তুতপক্ষে ঐ বিদ্যেটার কার্যকারিতা নিয়েও মনে মনে ঘোরতর সন্দেহ আছে তাঁর। কিন্তু সেসব গুহ্য বিষয় তো আর অন্যদের সামনে প্রকাশ করা চলে না।
স্কুল-মাস্টার যতীনবাবু বললেন, 'কাপালিকমশাই, তুমি মন্দিরের সেবায়েত। তা সত্ত্বেও মায়ের বিগ্রহ ভেঙে দিয়ে গেল? তাহলে কি মা আর জাগ্রত নেই? মা জাগ্রত থাকলে বিগ্রহ যারা ভেঙেছে তাদের হাত তো খুলে পড়ার কথা।'
মনোহর কাপালিকের আঁতে ঘা লাগল। ক্ষুন্ন মনে বললেন তিনি, 'ওসব সত্য যুগে হত। পাপে ছেয়ে গেছে চারিদিক। এখন আর ওসব হয় না। এখন জোর যার মুলুক তার। রামকৃষ্ণদেব বলেছেন, যে সয় সেই রয়। মানে জুলুমবাজদের জুলুম যারা সইতে পারে তারাই রয়, বাকি সবাই বিলুপ্ত হয়। এখন মাথা গরম করার সময় নয়। ওরা তো খালি কষ্টি পাথরের বিগ্রহই ভেঙেছে। আমাদের অন্তরে মায়ের যে মুর্তি রয়েছে, তা তো আর ভাঙতে পারেনি! বিগ্রহ আবার আমারা তৈরী করে নিতে পারব। সমস্যা কী?'
করালীমোহন বলল, 'না ব্যাপারখান মোটেই সুবিধার লাগতাছে না। থানায় একখান ডাইরি কইর‍্যা রাখন লাগব।'
'অ্যাঁ, থানায় ডাইরি করে কী যেন হবে!’ রতন সামন্ত বলল, ‘কাক কি কাকের মাংস খায়? লাঠি সোটা নিয়ে বেরিয়ে পড়। আমাদের একখানা মন্দির ভেঙেছে, আমরা দশখানা মসজিদে আক্রমণ করব। নইলে ব্যাটাদের শিক্ষে হবে না।'
রতন সামন্তর আস্ফালন উপস্থিত সবাইকে সন্ত্রস্ত করে তোলে।
করালীমোহন বিরক্ত হয়ে বলে, 'তুই চুপ কইর‍্যা থাক। ফ্যাচর ফ্যাচর বন্ধ কর। তোর জন্যি ধনে প্রাণে মারা পড়তি হবে দেহি। বলি চাপাতি ঘাড়ে পড়লে ঠেকাবে কেডা? '
যতীন মাস্টার বললেন, 'আমারও মনে হয়, থানায় একটা ডায়রি করে রাখা দরকার।'

সংখ্যাধিক্যের ভোটে শেষে থানায় যাওয়াই সাব্যস্ত হল। দারোগাবাবু চিরতার পাঁচন গেলার মত মুখ করে বললেন, 'এই সব সন্ত্রাসবাদীদের জন্যে আমাদের দেশের মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদেরও তো সংখ্যাগুরুর সেন্টিমেন্ট অবহেলা করা চলে না। আপনাদেরও বলছি, উস্কানিমূলক কোনও কাজ করবেন না। তাহলে আপনাদের গ্রেফতার করতে বাধ্য হব। আপনারা তো অভিযোগ করছেন, কিন্তু কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন শুনি? কি দরকার গোলমাল বাড়িয়ে? কেউ খুনটুন হলে না হয় কথা ছিল। ভেঙেছে তো একটা মুর্তি। সেটা আবার গড়ে নিলেই ঝামেলা চোকে। সংখ্যাগুরু যেখানে মুর্তি পুজো পছন্দ করে না, সেখানে আপনাদেরই-বা মুর্তিপুজোর এত আঠা কেন? অন্যের ধর্মে আঘাত দিলে গ্রেফতার করার আইন আছে তা জানেন? আপনারা যে নিজেদের ধর্ম বজায় রাখতে সুযোগ পাচ্ছেন সেটাই কি বড় কথা নয়?'
থানা থেকে বেরিয়ে রতন ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, 'দেখেছ? একে তে কেস নিল না, উলটে আমাদেরই গ্রেফতার করার হুমকি দিয়ে রাখল। আমি আগেই বলেছিলাম, কাক কাকের মাংস খায় না।'
যতিন মাস্টার বললেন, 'দারোগাই দেশের মোড়ল না কি? আমরা সাংসদের কাছে যাব। আমদের সংসদ জানে আমরা তাকে ভোট দিই।'
করালীমোহন বলল, 'তাতে হইল ডা কি? উনি আমাগো স্বার্থ দ্যাখবেন না জাতভাইগো স্বার্থ দেখবেন?'
ব্যর্থমনরথ হয়ে তারা মন্দিরে ফিরে এসে দেখল মন্দিরের দেওয়ালে পোস্টার পড়েছে।
“হালা মাউনের বাচ্চারা, তগো সাহস তো কম না। থানায় গেছিলি কোনডা বইল্যা? এহন তগো কালীরে ভাঙছি। কালী আমাগো কিছুই করতি পারে নাই। এহনও সময় আছে, সহি ধর্ম নে। ভাড়াবাড়ি করলে, তগো কল্লা হ্যালায় দিমু। এক হপ্তা সময় দিলাম, হয় আমাগো ধর্ম নিবি নইলে এ দ্যাশ ছাইড়্যা যাবি।"
যতীন মাস্টার বললেন, 'উফ কী অশ্লীল ভাষা, আর বানানও ভুল গুচ্ছেরখানেক, ছ্যা ছ্যা।' যেহেতু তিনি স্কুলের বাংলা ভাষার শিক্ষক সুতরাং ভুল বানান তাঁকে যে প্রবলভাবে পীড়িত করে, তা বলা-ই বাহুল্য।
মনোহর কাপালিক বললেন, 'রাখো তো তোমার পণ্ডিতি! এক হপ্তা সময় দিয়েছে দেখেছ?'
'তোমার মন্ত্রের জোর দেখাও। তোমার ক্ষমতাটা এবার দেখি।' বললেন যতিন মাস্টার।
'আমি তো নিমিত্ত মাত্র।’ মনোহর কাপালিক বললেন, ‘সবই মা কালীর ইচ্ছা। যার কেউ নাই তার মা কালী আছে। তোমরা হতাশ হচ্ছ কেন? মা কালী আমাদের রক্ষা করবেন।'
রতন বলল, 'মা কালী নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারল না। আমাদের কী রক্ষা করবে? দুত্তুরি!'
'নাস্তিকের মত কথা বলিস না তো!' ফুঁসে উঠলেন মনোহর কাপালিক, 'মা কালীর রোষ তো দেখিসনি! মা আমাদের রক্ত খেকো দেবী। খারাপ কথা বললে মুখে রক্ত উঠে মরবি।'
'মাকে যে ওরা ভেঙে রেখে গেল, তাতে কোনও দোষ হল না, আর আমি মায়ের শক্তি নেই বললেই দোষ?' রতনও ফোঁস করে উঠল।
'মায়ের লীলা কে বুঝতে পারে, বল?' মনোহর কাপালিক তপ্ত রতনকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু রতন ঠাণ্ডা হবার ছেলেই নয়। ক্রদ্ধ স্বরে সে বলল, 'এবার কী আমাদের ধর্মান্তরিত হতে হবে? সেটাই কি মায়ের ইচ্ছা?'
'মা নিশ্চয়ই আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন।' মনহর কাপালিকের মুখ থেকে স্তোকবাক্য ঝরে পড়ল।
করালীমোহন বলল, 'ওরা কিন্তু আমাগো এক হপ্তা সময় দিছে। ও ঠাকুর, মায়ের সঙ্গে তো আপনের কথাবার্তা হয় বলেই শুনিছি। মায়ের কাছে এই অনাচারের একটা বিচার চাইলে হয় না? ধর্ম যেমন ছাড়া যায় না, তেমনি জন্ম ভিটে, বাপ দাদার ভিটে, হেইডাই বা ছাড়ি ক্যামনে?’
করালীমোহনের কথা অনেকেরই মনঃপুত হল। মনোহর কাপালিকও সুযোগটাকে হাতছাড়া করলেন না। তিনি বললেন, 'তোমরা কিছু ভেব না। আজ রাতেই আমি ধ্যানে বসব। মা যতক্ষন না দেখা দেয় ততক্ষণ উঠব না।'
পরদিন সকাল সকাল গ্রামবাসীরা মনোহর কাপালিকের বাড়িতে উপস্থিত হল। মনোহর কাপালিক বললেন, 'ওরে, রাতে মা আমাকে দেখা দিয়েছেন। মা বলেছেন, পুরনো বিগ্রহ মায়ের আর পছন্দ নয়। মন্দিরটাকে সারিয়ে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে বলেছে মা।'
মনোহর কাপালিকের ক্ষমতার উপর গ্রামবাসীদের আস্থা আছে। তাঁর সঙ্গে যে মা কালীর ডাইরেক্ট কানেকশন আছে, সেই ব্যাপারে তাদের মনে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু মন্দির সংস্কার, নতুন দেবী মূর্তি— এসবে খরচও তো কম নয়। আবার মায়ের ইচ্ছা বলে কথা। সেই ইচ্ছা পূরণ না করলে তো সর্বনাশ! অগত্যা চাঁদা তোলা হল। সকলেই নিজের নিজের সাধ্যমত দান করতে কার্পণ্য করল না। চাঁদা সংগ্রহের পর গ্রামবাসীরা সোৎসাহে মন্দির সংস্কার করল। ঢাক ঢোল পিটিয়ে মহাসমারোহে নতুন মূর্তিও প্রতিষ্ঠা করা হল। কিন্তু পরের দিন সকালেই দেখা গেল, বিগ্রহ আবার ভেঙে পড়ে আছে। শুধু তাই-ই নয়, মন্দিরের ভীতরে গরুর হাড়গোড় ছড়িয়ে আছে। দেয়ালেও পোস্টার পড়েছে।
করালীমোহন মনোহর কাপালিককে বলল, 'এ কেমন কাণ্ড হইল ঠাকুর? মায়ের লাইগ্যা এত খরচ হইল, তাও মায়ের দয়া হইল না?'
রতন বলল, 'এইভাবে হবে না লাঠি ধরতে হবে আমাদের।'
করালীমোহন রতনের মুখ চেপে ধরে বলল, 'কস কী! কস কী! আমাগো লোকবল কম হেই খেয়াল রাখস।'
যতীন মাস্টার কাহিল গলায় বললেন, 'মনোহর, আরেকবার ধন্না দেবে না কি হে?'
'নিশ্চয়। মায়ের কৃপা না হলে কী আর বাঁচা যায়?' মনোহর কাপালিক বললেন, ‘এই বার মন্দিরেই হত্যে দিয়ে পড়ে থাকব। দেখি মা কিভাবে ছলনা করে!’
সেদিন রাতে মনোহর কাপালিক মন্দিরেই থেকে গেলেন। গ্রামবাসীরা তাঁর উপর যে ভরসা করে, সেই ভরসাই তাঁর রুটি-রুজি। সেই ভরসাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে একরাত দু-রাত নয়, বছরভর তিনি মায়ের মন্দিরে ধন্না দিতে পারেন।  
রাতে মন্দিরের দরজা ভাল করে বন্ধ করে, করোটি-পাত্রে কারণবারি পান করে মায়ের সামনে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন মনোহর কাপালিক।
গভীর রাতে দরজা ধাক্কানোর শব্দে সচকিত হয়ে উঠে বসলেন কাপালিক। প্রদীপ নিভে গেছে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দরজায় মুহুর্ম্মুহূ ধাক্কা পড়ছে। কাপালিক আতঙ্কে ইষ্টদেবীর নাম জপ করতে লাগলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য! ইষ্টদেবী রক্ষা করতে এলেন না। বরং বারংবার ধাক্কায় দরজাটাই ভেঙে পড়ল। মুখে কালো কাপড় বাঁধা চার চারটে ষণ্ডা ভীতরে ঢুকে পড়ল। মশালের আলোয় ঝলসে উঠল চাপাতি।
'আ-আমায় মেরো না। যা আছে নিয়ে যাও।' জড়ানো গলায় বললেন মনোহর কাপালিক।
'নেবার মত কী আছে রে তগো মন্দিরে, হালা মালুর বাচ্চা? আমাগো দ্যাশে থাইক্যা পুজা করনের সাহস হয় কেমন কইর‍্যা? হ্যার লাইগ্যা তর শাস্তি পাওনা আছে।'
মনহরের জটা ধরে টেনে তুলে একজন হাঁড়িকাঠে তাঁর মুণ্ডু চেপে ধরল। উদ্যত চাপাতি নেমে এল মনোহরের ঘাড় লক্ষ্য করে। তাঁর গলা দিয়ে শব্দ বেরল, 'ব্যা—'
সেই শব্দ কানে যেতেই ঘুমটা ভেঙে গেল। চমকে উঠে মনোহর  কাপালিক ঘাড়ে হাত বোলালেন। না ঘাড় অক্ষত আছে। মন্দিরের দরজা খুলে বাইরে এলেন মনোহর কাপালিক। মন্দিরের উঠোনে একটা ছাগল চরছে।
মন্দিরের দাওয়ায় বসে মনোহর রাতের দেখা দুঃস্বপ্নটা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। ভাগ্যিস ঘটনাটা নেহাতই স্বপ্ন! কিন্তু ভোরের স্বপ্ন। ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়, এ কথা তো ছোটবেলা থেকে শোনা। তাহলে কি... নাঃ আর ভাবতে পারছেন না মনোহর কাপালিক।

***

এক জন দুজন করে গ্রামবাসী এসে মন্দির চত্তরে ভিড় বাড়াতে লাগল। মনোহর কাপালিকের মুখ থমথমে।
যতীন মাস্টার জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার হে মনোহর? মা কালী দেখা দিলেন?'
করালীমোহন বলল, 'মা কালী কী কইলেন ঠাকুর?'
মনহর কাপালিক দীর্ঘিশ্বাস ফেলে বললেন, 'মায়ের নির্দেশ পেয়েছি। তবে সে তো বিশেষ সুবিধের কথা নয়।'
'কী বলেছে মা?' সমস্বরে শুধাল গ্রামবাসীরা।
মনোহর কাপালিক জবাব দিলেন, 'মা বলেছে, এ-দেশ-ই-বা কার ও-দেশ-ই-বা কার? সবই তো আমার। তোরা মিছেই মায়া করছিস। আমার ঐ দেশ দেখার সাধ হয়েছে। তোরা সবাই ঐ দেশে চল। ওখানে গিয়ে আমাকে স্থাপন কর। তোদের মঙ্গল হবে।'
মায়ের নির্দেশ বলে কথা। অতএব, গ্রামবাসীরা যে যার সম্পত্তি জলের দরে বেচে এক রাতে মায়ের ভাঙা বিগ্রহ মাথায় নিয়ে দালাল ধরে সীমান্তরক্ষীদের ম্যানেজ করে পার্শবর্তী দেশে সেঁদুল।

***

হাঁটতে হাঁটতে পা ধরে গিয়েছিল। সিধে রাস্তা হলে এত কষ্ট হত না। জল-জঙ্গল খানা-খন্দ পেরিয়ে এক জায়গায় এসে মনে হল, পরিশ্রম সার্থক। এই তো সেই নিরাপদ দেশ। নির্বাসিত জীবন এখানেই কাটানো যাবে। কিন্তু মনের মধ্যে স্বস্তি এল না। অস্বস্তি হওয়াই স্বাভাবিক। অচেনা-অজানা একটা দেশে ঢুকে তো পড়া গেল কিন্তু এখানকার নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে কি? অনুপ্রবেশকারী বলে পাকড়াও করে এখানকার সরকারবাহাদুর আবার ওই পোড়াদেশে পাঠিয়ে দেবে না তো? তাহলেই তো চিত্তির!

প্রধান সড়কের পাশে একটা মন্দিরের সামনে এসে তারা থামল। পূব আকাশ ফরসা হয়ে এসেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য উঠবে।

***

সূর্য উঠল। মন্দিরে লোকজন আসতে লাগল। কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তারা ওদের দিকে তাকাতেও লাগল। কয়েকজন এগিয়ে এসে না না প্রশ্ন করা শুরু করল। বিড়ম্বনার শেষ নেই! কতক্ষণ আর সত্যি গোপণ করা যায়?
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা কোলাহল শোনা গেল। রাস্তা দিয়ে একটা মিছিল আসছে। রাজনৈতিক মিছিল। মিছিল সামনে আসতেই প্রশ্নকর্তারা ওই মিছিলে যোগ দিল। কিন্তু নিশ্চিন্ত হবার কী আর যো আছে? মিছিল থেকে বেরিয়ে ক্যাডার গোছের কতগুলো লোক এগিয়ে এল। তারা ওদের ধরে নিয়ে মিছিলে ভিড়িয়ে দিল। এক জন কানে কানে বলল, ওদের কথা শুনে চললে ভোটার কার্ড, রেশনকার্ড, আধার কার্ড পেতে কোনও সমস্যা হবে না।
মিছিল এগিয়ে চলল। দৃপ্তস্বরে আওয়াজ উঠল, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়তে হবে একসাথে।’
মনোহর, যতীন, রতন, করালী মিছিলের সঙ্গে গলা মেলাল, ‘একসাথে— একসাথে।’

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ