সারারাত প্রবল বর্ষণ শেষে এবাড়ির চারপাশটা বড্ড স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে । আমার সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। ভোরের নরম আলো ভাঙ্গা ঘরটিকে পরম স্নেহে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে দেখে ভারি আনন্দ হচ্ছে আমার। বাবা যদি আজ এই দৃশ্য দেখতে পারতো।
আজ একটু বেলা করে বাড়ি থেকে বেরোলাম। কারখানায় কোনও কাজ নেই। পুজোর ছুটি পড়ে গেছে। আজ মহাপঞ্চমী। বেতন-বোনাস পাওয়ার দিন। স্ত্রী নির্মলার শাড়ি আর ছেলে বিধুর জামা কিনে তবেই বাড়ি ফিরব আজ। স্টেশনে যাওয়ার পথে মিত্তির বাড়িটা ঘুরে এলাম। কিন্তু নির্মলাকে পেলাম না। ওবাড়ির বড় বউ দু'টো কড়া কথা শুনিয়ে দিল "পুজোর বাড়ি কাজে না এলে পুরো মাইনে দিতে পারবো না বাপু। টাকা তো আর এমনি এমনি ফলে না।"
নির্মলার প্রিয় বাসন্তী রঙের শাড়ি এনে ওকে চমকে দেবো আজ। মনে পড়ে সেই রাত সেই মুহূর্ত প্রথম যেদিন নির্মলার মুখোমুখি হয়েছিলাম। ওর পরনে ছিল একটি লালরঙা বেনারসি। দামে সস্তা প্রসাধনের গন্ধ মাখা নির্মলার শরীরের উপর যখন আমার ভাঙ্গা ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে এক ফালি জ্যোৎস্না এসে পড়েছিল তখন পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য্য যেন আমার হাতের মুঠোয় নেমে এসেছিল।
তারপর থেকে সেই প্রশান্তি সেই উন্মাদনা আর পাইনি। সংসারে এত অভাব। অভাবের তাড়নায় নির্মলার মুখোমুখি হতে পারিনি। শুধু যন্ত্রের মতো একসঙ্গে থেকেছি। আজ অনেকদিন পর নির্মলার সামনে গিয়ে দাঁড়াবো। মন ভরে সুখ-দুঃখের কথা বলবো। আর যে কিছুই চাওয়ার নেই।
স্টেশনের মুখে চায়ের দোকান থেকে বকুল কাকা খিকখিক হাসিতে ডাক পারল -
এইযে ব্রজেন কোথায় যাচ্ছ?হে হে তা তোমার বন্ধু বিমল যে আজ সঙ্গে করেই...
আমি দু'হাত দিয়ে কান চেপে ধরে স্টেশনের দিকে চললাম। ওঁর বাকি কথাটুকু কানে প্রবেশ করল না। আজ সঙ্গে আমার ছেলে বিধু রয়েছে। এদের কি লাজ-লজ্জা বলতে কিছু নেই। হপ্তা দুয়েক ধরে বকুল কাকা বিমল আর নির্মলাকে নিয়ে আমার কানে বিষ ঢালছে। ইদানিং রাস্তাঘাটে আমাকে দেখলেই ঠাট্টা করছে ।তাতে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গায়ে বিন্দুমাত্র আচ লাগেনি। আর আমার দেবতুল্য বন্ধুর সম্পর্কে কেউ বাজে কথা বললে আমার ভেতরটা যেন পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই বিমল এর জন্যই এক মাস আগে শহর কলকাতার একটা কারখানায় চাকরি পেয়েছিলাম। আজ আমার মনের সমস্ত প্রশান্তি এই বিমলের জন্যই। বিমলের ঋণ শোধ হবার নয়। বকুল কাকার নোংরামোর প্রতিবাদ আমি কখনোই করতে পারিনি। অভাবের তাড়নায় আমার প্রতিবাদের সমস্ত শক্তি হারিয়ে গেছে। নির্মলার সঙ্গে তা নিয়ে কম বিতণ্ডা হয়নি।
-আজ কখন ফিরবে বাবা?
-বেলা ডোবার আগেই ফিরে আসবো।
-আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।
- তুই এখন ফিরে যা বাবা। মিত্তির বাড়িটা একটু দেখে যাস তোর মা এলো কিনা।
- আচ্ছা বাবা।
সংহতি স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়া অবধি বিধু দাঁড়িয়ে রইল। বিধুর মুখে তখন আশ্বিনের রোদ ঝলমল করছে।বিধু আমার বড় ন্যাওটা হয়েছে। বাবাকে ছাড়া সে কিছু ভাবতেই পারেনা। প্রতিদিন বেলা গড়ালে নির্মলা যখন খোলা আকাশের নিচে উনুন জ্বলে, বিধু তখন একবুক খিদে নিয়ে আমার দিকে গভীর সম্মোহনে চেয়ে থাকে। শহরের উচু উচু দালান আর গাড়ি-ঘোড়ার গল্প শুনে বিধু স্বপ্নে বিভোর হয়ে যায়।
ট্রেনটি গুমা স্টেশন ছাড়ল। চারপাশের কোলাহল আমাকে স্পর্শ করছে না। বিধুর কথা ভাবতে ভাবতে এই ভিড় ট্রেনে বাবার মুখটা ভেসে উঠল। আমরা গরিব বলে ছোটবেলায় বাবার প্রতি অনেক রাগ হতো। আমরা ছিলাম ভিটেহীন। যশোর রোডের পাশে সরকারি জমিতে একটি তাঁবুর নিচে আমরা থাকতাম। প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটে বাবা অনেক দূরে কাজে যেতেন। একবার আমার বালকবেলায় ফুল বিক্রি করা পয়সায় বাবাকে এক জোড়া হাওয়াই চপ্পল কিনে দিয়েছিলাম। ছেলের এই কম্ম দেখে আমার পঙ্গু মায়ের চোখে-মুখে সে কি আনন্দ। বাবা তখন দুহাত ভরে চপ্পল জোড়া হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে।
-তোমার চপ্পল জোড়া পছন্দ হয়েছে তো? মা বলল।
-আমার আবার পছন্দ-অপছন্দ। এত সুখ কি আমার সইবে।
- কাল থেকে এটা পরেই কাজে বেরোবে কিন্তু।
- আমার এক রত্তি ছেলের কষ্টের টাকায় কেনা এই চপ্পল আমার পায়ের নিচে রাখি কি করে ব্রজেনের মা। এই চপ্পল যে আমার বুকে নিয়ে ঘুরতে ইচ্ছে হয়।
বাবার চোখ থেকে তখন আনন্দ্অশ্রু ঝরছে। তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে আমিও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি সেদিন। তারপর একদিন আমার বাবা-মা আমাকে অনাথ করে দুজনেই পরপর কলেরায় মারা গেল।
শিয়ালদহ স্টেশন থেকে যখন বেরোলাম বেলা তখন মধ্য গগনে। হাঁটাপথে কলেজ স্কোয়ার মাত্র পনের মিনিট। শহরের ভাবখানা আজ গমগমে ।উৎসবমুখর বাতাসে ধূপধুনোর গন্ধ ভেসে আসছে। রাস্তার দুধারের ফুটপাতে ঝাঁকে ঝাঁকে বসেছে অস্থায়ী দোকান। পুজোর বাজার। বিক্রির আশায় দোকানিরা ডাকলে আমি পুলকিত হই। তাকে সাঁজানো রংবেরঙের চুড়ি। দাদা চুড়ি নেবেন? সারে সারে সাজানো বম্বে শাড়ি, কলকাত্তাই শাড়ি,ঢাকাই শাড়ি। দাদা কোনটা নেবেন? এসব কথা শুনে আমি আনন্দে ভেসে যাই। বারবার নির্মলা আর বিধুর মুখখানা ভেসে ওঠে। চমকে দেব আজ।
- বাবু, একটু দেরী হয়ে গেল আজ। আমার মাইনেটা দিয়ে দিন।
হাত কাচুমাচু করে ম্যানেজারকে আনন্দের সহিত বললাম, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে আজ।
- কি বলছো, ব্রজেন। একথা বলে শংকর বাবু আমার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন।
- আজ্ঞে, মাইনেটা যদি একটু...
- তোমার মাইনে তো নিয়ে গেছে।
- কে নিয়ে গেছে? আমার সমস্ত শরীর ততক্ষণে ধুকধুক শব্দে ছেয়ে গেছে।
- তোমার বন্ধু বিমল। আমিতো দিতে চাইনি। সঙ্গে তোমার বউ নির্মলা ছিল। তাই... । তুমি হাসপাতালে ভর্তি জেনে আমি দেরি না করে মাইনেটা ওঁদের হাতে দিয়ে দিলাম।
আমার আর কোনও কথা বলার শক্তি ছিলনা তখন। কারখানা থেকে বেরিয়ে আমি গন্তব্যহীন পথে হাঁটছি। রাতের সমস্ত বর্ষণ যেনো আমার দিকে ধেঁয়ে আসছে আবার। ঝিরিঝিরি ঘামে ভিজছে সমস্ত শরীর। নির্মলা মিত্তির বাড়িতে কাজে যায়নি। বকুল কাকার মুখে "বিমলের সঙ্গে আজ" - এটুকু কথা আবার কানে বেজে উঠল। শেষ পর্যন্ত বিমল। না না এ কি ভাবছি আমি। সব যেন মিথ্যে হয় ঠাকুর। কোনও হিসাব মিলছে না আজ। নির্মলার টাকার প্রয়োজন ছিল আমাকে বললে সব উজার করে দিতাম। তাহলে কেনো? টাকা নিয়ে নির্মলা গেলটা কোথায়। বাড়ি ফিরবে তো? নাকি পঞ্চমীতেই সমস্ত সম্পর্ক বিসর্জন দিয়ে চলে গেল অন্য কোন ঘাটে অন্য কোন দেশে। আতঙ্ক আর ভয়ে আমি অন্তঃসারশূন্য হয়ে গেছি। দিকশুন্য হয়ে শহরের অলিগলি দিয়ে ছুটছি। কেউ কি নেই যে আমাকে পথ দেখিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবে।
এই শহরে আমি বড় একা। কোথাও কেউ নেই। যশোর রোডের সেই তাঁবুর মধ্যে থেকে বাবা যেনো হাত বাড়িয়ে ডাকছে। ব্রজেন আয় বাবা। ফিরে আয়। আমি কি বাবার কাছে ফিরে যাবো। না। বেলা গড়ালে বিধু আমার জন্য অপেক্ষা করবে। বিধু কি তার বাবাকে আজ ক্ষমা করতে পারবে। বিধু... । বিধু রে... । আমি তোর বাবা হওয়ার যোগ্য নইরে বিধু। তুই ফিরে যা।
আশ্বিনের বেলা পশ্চিমে নেমে গেছে তখন। জীবনের সমস্ত ক্ষুধা, যন্ত্রণা, জয়, পরাজয় শূন্যে ভেসে গেছে। আমি অজানায় ছুটে চলেছি। কোথায় ছুটছি ঠিক ঠাহর হয় না । আমার চোখের অঝোর বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে এই শহরের ধুলো-বালি-পথ। অথচ কেউ দেখছে না।
এই শহরে কত মানুষ। গতিময় তাদের জীবন। বর্ণময় নিয়তি। অথচ একই আকাশ একই পৃথিবী।
(ছবিঋণ : ফাইনআর্ট আমেরিকা। কিশোর মজুমদার।)

0 মন্তব্যসমূহ