Header Ads Widget

পাপ্পু ফির ফেল কর গয়া || প্রবীর মজুমদার

 


সাত সক্কালে মোবাইল ফোন একটা অদ্ভুত শব্দ করে জানাল মেসেজ এসেছে। পাপ্পু মেসেজ দেখে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত দুটো ছাদের দিকে ছুঁড়ে লাফিয়ে উঠে 'ইয়াপ্পি' বলে চিৎকার করে উঠল।
বই থেকে মুখ তুলে বললাম, 'কীরে ব্যাটা? পাগল হয়ে গেলি নাকি?'
পাপ্পু আনন্দে নাচতে নাচতে স্বরচিত সুরে গাইতে লাগল, 'জিতে গেছি জিতে গেছি।'
পরমেষ মুখ বেঁকিয়ে বলল, 'তা কি যুদ্ধে জয় লাভ করলে হে?'
পাপ্পু নাচ থামিয়ে পরমেষের দিকে একবার আর একবার আমার দিকে তাকিয়ে নাটুকে ঢঙে বলল, 'যুদ্ধ? তা একরকম যুদ্ধই বটে। অবশেষে মাম্পি আমার প্রেমে ধরা দিল। তিন তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বীককে হারিয়ে বিজয় মাল্য এল আমারই গলে!'
পাপ্পু আবার নাচতে লাগল। সেই সঙ্গে বিদঘুটে উনসুরো গলায় করতে লাগল রবীন্দ্র সংগীতের শ্রাদ্ধ:-
'আমি কী কথা স্মরিয়া এ তনু ভরিয়া পুলক রাখিতে নারি
আমার মন মানে না...’
আমি আবার নিজের পড়ায় মন দিলাম। আর পরমেষ অসম্পূর্ণ ঘুমটাকে সমাপ্ত করার জন্য অন্যদিকে ফিরে চোখ বুজল।
পাপ্পুর এই রকম অতিনাটকীয়তা আমাদের কাছে নতুন নয়। প্রেমের ব্যাপারে বারংবার ব্যর্থতা সত্ত্বেও তার অধ্যবসায় অটুট। তাই দিনকে দিন পরিহাসের পাত্র হয়ে উঠছে, তবু হুঁস নেই ওর। কারণে অকারণে ও এতটা উচ্ছসিত হয়ে পড়ে যে, ওর আবেগকে আমরা আর গুরুত্ব দিতে উৎসাহ পাই না।  
নাচ থামিয়ে পাপ্পু মোবাইল ফোনটা আমার চোখের সামনে ধরে বলল, 'তোরা তো বলতি মাপ্পি আমাকে পাত্তা দেয় না, তা সত্ত্বেও আমি ওর পেছনে ছিনেজোঁকের মত কেন পড়ে রয়েছি! সবুরে মেওয়া ফলে বুঝলি? কষ্ট না করলে আনকোরা তো দূর, রাধাও পাওয়া যায় না। দ্যাখ দ্যাখ, মাম্পি আইনক্সে দুটো টিকিট কাটতে বলেছে। আজ ম্যাটিনি শো। আমি আর মাম্পি, মাম্পি আর আমি। হু হু বাওয়া, আমার কুষ্ঠিতে আছে প্রেম করে আমার বিয়ে হবে।'
পাপ্পু সেদিন কলেজে গেল না। সেলুনে গিয়ে ফেসিয়াল করে এল। সার্ট প্যান্ট ভাল করে প্রেস করল। মাথায় শ্যাম্পু করল, সাবান মেখে স্নান করল। উত্তেজনায় ভাল করে খেতেও পারল না সে। দুপুরের দিকে গায়ে ডিওড্রান্ট মেখে, মুখে বিউটি ক্রিম মেখে হস্টেল থেকে বেরল।

***

গভীর রাতে যখন পাপ্পু ফিরল তখন তার অবস্থা দেখে তো আমাদের চোখ চড়কগাছ! মাঞ্জা উধাও হয়ে তার অবস্থা ঝোড়ো কাকের মত। জামার বোতাম ছিঁড়ে গেছে। মাথার চুল উস্খো-খুস্খো। মুখে মদিরার গন্ধ।
আমরা সবাই পাপ্পুকে ঘিরে ধরলাম। কী ঘটেছে না জানতে পারলে আমাদের পেটের ভাত হজম হবে না।
অনেক পীড়াপিড়ির পর পাপ্পু ঘটনাটা আমাদের বলল।
দারুন রোমান্টিক, সুপার ডুপার হিট ফিল্ম বলে টিকিটের লাইনে বেশ ভিড় ছিল। অনেক কসরত করেও যখন টিকিট পাওয়া গেল না তখন পাপ্পু ব্ল্যাকে টিকিট কিনল। সিনেমা শুরুর পাঁচ মিনিট আগে মাম্পি এল। সঙ্গে একটা হুকোমুখো হ্যাংলাও ছিল। মাম্পি টিকিট দুটো নিয়ে পাপ্পুকে অনেক করে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, 'আয় তোদের পরিচয় করিয়ে দিই।' হ্যাংলাটাকে দেখিয়ে মাম্পি বলল, 'এ হল আমার বয়ফ্রেন্ড। ফেসবুকে আলাপ। স্টেটসে থাকে, এখানকার কিছু চেনে না। তাই তোকে টিকিট কেটে রাখতে বলেছিলাম। এত কষ্ট করে তুই টিকিট কেটে দিলি, তোকে কী বলে  যে ধন্যবাদ দেব! সত্যি তুই আমার খু—ব ভালো বন্ধু।' এই বলে মাম্পি হ্যাংলার হাত ধরে সিনেমা হলের দিকে পা বাড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সুর করে জানিয়ে গেল, 'বা—ই।'
হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল পাপ্পু। তারপর হঠাৎ করে তার মনে জিঘাংসা জেগে উঠল। সে ছুটে গিয়ে মাম্পির হাত টেনে ধরে বলল, 'ম্যাডাম, টিকিটের দামটাতো দিলেন না।'
সেই কথা শুনে সিকিউরিটি গার্ড ছুটে এসে বলল, 'টিকিট ব্ল্যাক করতা হ্যায়?' অবস্থা বেগতিক দেখে পাপ্পু দৌড়ে পালাতে গেছে, কিন্তু সিকিউরিটি গার্ডের দক্ষতার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনি। দুমাদ্দুম কিল চড় পড়েছে পাপ্পুর উপর। তারপর তাকে তুলে দেওয়া হয়েছে পুলিশের হাতে। বহুক্ষণ লকআপে অটকে রাখার পর পকেটে যা মাল-কড়ি ছিল সব হাতিয়ে নিয়ে তবে পুলিশ ছেড়েছে তাকে। প্রেমিকা হারানোর দুঃখ তাও সহ্য করা যায়, প্রেমিকা ভেগে গেলে আরেকটা প্রেমিকা আসবে,  কিন্তু টাকা হারানোর কষ্ট কি সহজে হজম হয়? তাই সমস্ত কিছু ভোলার জন্যে শুঁড়িখানায় গিয়ে বাকিতে মদ কিনে খেয়েছে সে। তারপর হোষ্টেলে ফিরেছে।
“ইস ত্যারহা পাপ্পু ফির ফেল ক্যার গয়া।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ