সুদেব
বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। অপেক্ষা করতে কাঁহাতক আর ভাল লাগে? বিরক্ত
হয়ে ঘুমিয়ে পড়তেও পারছে না সে। সদ্য সদ্য বিয়ে হয়েছে, গ্রাম গঞ্জের
সংস্কৃতি মেনে দিনের বেলা না হয় বউয়ের ধারে কাছে ঘেঁসতে নেই, তা বলে কি
রাতের বেলাতেও ব্রহ্মচারী হয়ে থাকতে হবে? একান্নবর্তী পরিবারের জোয়াল এখনই
নতুন বৌটার ঘাড়ে কি না চাপালেই চলছিল না? বাড়ির গার্জিয়ানদের উপর ক্ষোভে
সুদেব মনে মনে গর্জায়, আর কান পেতে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা টুকরো-টাকরা কথা
বা থালা বাসনের টুংটাং শব্দ শুনে রান্নাঘরে বউয়ের ডিউটি কখন শেষ হবে তা
আঁচ করার চেষ্টা করে। আজ আবার পৌষপার্বণ। সুদেবের বৌ শাশুড়ী, ননদ, জা-দের
সঙ্গে পিঠে বানানোয় ব্যস্ত। এদিকে যে সারা সপ্তাহের হাড় ভাঙা খাটুনির পর
স্বামী বাড়ি ফিরে একটু সেবা পাবার জন্যে ছটফট করছে এই খেয়াল কি বৌটার আছে?
আচ্ছা বেআক্কেলে বলতে হয়! আজ বেটিকে আচ্ছা করে শিক্ষা দিতে হবে, যাতে
স্বামীকে অবহেলা করার আগে ভবিষ্যতে দু-বার ভাবে। কী ভাবে শিক্ষা দেওয়া যায়
সেই ফন্দি আঁটতে লাগল সুদেব। কিন্তু মাথায় কিছুই এল না। ফলে বিরক্তি আরো
বেড়ে গেল। এমন সময় দরজায় খুট করে শব্দ হল, দরজা খুলে কেউ ঘরে ঢুকল, সেই
সাথে ঘরে ঢুকে পড়ল এক ঝলক ঠাণ্ডা উত্তুরে হাওয়া। সুদেব লেপ মুড়ি দিয়ে
অন্যদিকে ঘুরে শুল।
"নাও আর ঘুমের ভান করতে হবে না। আমি এসে গেছি।"
নারী
কণ্ঠের এই সুধাবর্ষণেও সুদেব সাড়া দিল না। সে যে আদৌ অপেক্ষা করছিল, তা
মোটেই বুঝতে দেওয়া উচিত নয়। উপেক্ষা দিয়েই উপেক্ষার মোকাবিলা করতে হবে।
লেপের ভীতরটা হঠাৎ করে ভীষণ ঠাণ্ডা হয়ে গেল। বৌ যখন লেপের ভেতরে ঢুকেছে কাবাব মে হাড্ডি হিসেবে একরাশ শীতও ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
কিছুক্ষণ
বৌ-এর কোনও সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। সুদেব ভেবেছিল, বৌ হয়ত তার ঘুম
ভাঙানোর চেষ্টা করবে। আশা পূরণ না হওয়ায় সুদেব বিরক্ত হল। অবশেষে থাকতে না
পেরে ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, "লাইটটা কে নেভাবে?"
"এই য্যা, ভুলে গেছি একদম। নিভিয়ে দাও না!" লেপের ভীতর থেকে আদুরে গলায় উত্তর এল।
"এই ঠাণ্ডায় নীচে নামতে আমার বয়ে গেছে! ভুত হলে বর্তে যেতাম! হাত লম্বা করে লাইট নেভাতে পারতাম!"
"ভাল বললে তো! ব্যাপারটা মাথাতেই ছিল না। দাঁড়াও আমিই হাত লম্বা করে লাইট নেভাচ্ছি।"
সুদেবের ঘর থেকে এর পর একটা প্রাণান্তকর চিৎকার শোনা গেল। তাই শুনে সুদেবের বউ ঘরে এসে দেখল সুদেব বিছানাতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।

0 মন্তব্যসমূহ