নাহ্! মাথায় কিছু আসছে না। ফাঁকা ড্রামের মত মনে হচ্ছে মাথাটাকে। একেই বলে রাইটার্স ব্লক। সব লেখকদেরই কোনো না কোন সময় এমনটা হয়। এমন হলে কিছুতেই গল্পের প্লট মাথায় আসে না। বেশ কিছু পত্রিকার শারদ সংখ্যার জন্যে গল্প লেখার বায়না নিয়েছি। অথচ এই সময়ই এই বিপত্তি! এমন বিপত্তির সম্মুখীন আগে যে হইনি তা নয়, তবে এই রকম বন্ধ্যা অবস্থা এত দীর্ঘমেয়াদী হয়নি। জানি, ব্লক খুলে যাবে। প্লট আসবে, তারপর সেই প্লট বিস্তার লাভ করতে থাকবে। হয়ত বিস্তার লাভ করার সময়ে সেই প্লটই আরো বেশ কিছু গল্পের জন্ম দেবে। তাই মনের উপর অযথা চাপ দিলাম না। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
সামনে লেখার খাতা। একটা শব্দও আজ লিখতে পারিনি। অগত্যা খাতা বন্ধ করে ল্যাপটপ অন করলাম। মেইল চেক করা দরকার। না, কোন মেইল আসেনি। কথাতে বলে, নেই কাজ তাই খই ভাজ! অগত্যা ই-মেইলের স্প্যাম ফোল্ডার খুললাম।
স্প্যাম ফোল্ডার খুললে নিজেকে ভিআইপি বলে সন্দেহ হয়। আজও তার অন্যথা হল না। ওফ্ আমার কী সৌভাগ্য! বাব্বা! আমার ই-মেইল আইডি কোন এক কোম্পানির লটারিতে ১০লাখ টাকা জিতেছে। ব্যাঙ্ক একাউন্ট নম্বর, ডেবিটকার্ড, ক্রেডিট কার্ড বা এটিএম কার্ড নম্বর জানালেই আমার একাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করে দেবে। শুধুমাত্র একটাই সমস্যা, টাকাটা বাগাতে গেলে এককালীন ৩৫ ডলার দিয়ে ওদের সদস্য হতে হবে। অন্য মেইলগুলোও কম লোভনীয় নয়। বেশ কয়েকটা জীবনবিমা কোম্পানি সস্তায় আমার জীবনের দাম ঠিক করে দিয়েছে। খান পাঁচেক ব্যাঙ্ক আমাকে সহজ কিস্তিতে ঋণ দিতে চাইছে। আবার কয়েক জন ভিডিও-চ্যাটিংএর জন্যে প্রস্তাবও পাঠিয়েছে। ব্যাস, আর কী চাই?
জানি এই ধরণের প্রলোভনে অনেকেই পা দিয়ে প্রতারিত হয়। সুতরাং স্প্যাম ডিলিট করতে লাগলাম। চোখ কান বুজে স্প্যাম ফোল্ডারের সব ইমেইল সিলেক্ট করে ডিলিট করে দেওয়া অনেক সময়ই বুদ্ধিমানের কাজ হয় না। মাঝে মাঝে দরকারি ই-মেইল স্প্যাম ফোল্ডারে চলে আসতে পারে।
স্প্যাম ডিলিট করতে করতে একটা ই-মেইলে এসে আটকে গেলাম। হ্যারিস নামে একটা লোক তার বাড়িতে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আগেকার দিনে ঠগিরা বাড়িতে পথিকদের নিমন্ত্রন করে নিয়ে আসত। তারপর রাত্রে সেই অভ্যাগতকে খুন করে তার যথাসর্বস্ব লুঠ করে লাস মাটিতে পুঁতে দিত। আমাকে এক অপরিচিত লোক তার বাড়িতে আমন্ত্রণ করছে! আধুনিক ঠগিদের নতুন ফন্দী নয়ত? ই-মেইলটা ডিলিট করতে গিয়েও থমকে গেলাম। আবার পড়লাম। ঠিকানা বলছে, বারাসাতের কোনও একটা জায়গা। সে নাকি আমার পুরনো বন্ধু। ছোট্ট চিঠি। রোমান ফন্টে বাংলা লেখা।
হঠাৎ নিজের উপরেই হাসি পেল। হ্যারিস নয়। হরিশ। পড়বার ভুলে পরিচিত মানুষটা কেমন রহস্যময় হয়ে উঠেছিল। নাহ্, গল্প খুজতে খুঁজতে মাথাটাই গেছে। সাধারণ কিছুর মধ্যেও রহস্য কিংবা অপরাধের আভাস পাচ্ছি। এটা মোটেই মানসিক সুস্থতার লক্ষণ নয়। কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়া দরকার। আচ্ছা, হরিশের আমন্ত্রন গ্রহন করলে কেমন হয়? পুরনো বন্ধুর সঙ্গে মোলাকাতও হয়, আবার একটু হাওয়া বদলও হয়। চাইকি, নতুন পরিবেশে নতুন গল্পের প্লটও মাথায় এসে যেতে পারে।
হরিশের সঙ্গে দীর্ঘকাল যাবৎ কোনও যোগাযোগ নেই। যতদূর মনে পড়ছে কলেজ ছাড়ার পর আর দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। শুনেছিলাম গবেষণা করতে ও জার্মানি গেছে, সেখানে এক জার্মান মেয়েকে বিয়েও করেছে। মেয়েটা ওর সহকারী গবেষক হিসেবেই কাজ করত। সেখান থেকেই প্রেম। তারপর বিয়ে। এছাড়া আর কোন সংবাদ পাইনি। এতোদিন পর পুরনো বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ যখন এসেছে, তখন তা এড়ানো উচিত নয়। সামাজিকতা বলতেও একটা জিনিস আছে! অগত্যা আমি যাচ্ছি বলে হরিশকে ই-মেইল করে দিলাম।
হরিশের বাড়ি বারাসাত স্টেশন থেকে বেশি দূরে নয়। 'হরিশ বর্মনের বাড়ি যাব' বলতেই রিকশাওয়ালা বলল, 'হরিশ বর্মন? মানে ওই সাপ ব্যাঙের ডাক্তার?'
বলে কী? হরিশের ডাকনাম শুনে হাসি পেয়ে গেল আমার। রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, ‘তোমরা ওকে সাপ-ব্যাঙের ডাক্তার বলো কেন বলো তো?’
রিকশাওয়ালা খিকখিক করে হেসে বলল, ‘ওই ডাক্তার জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে সাপ ব্যাঙ ধরে বেড়ায়। আবার মোটা টাকায় ওসব কেনেও। সেই জন্যেই ওই নামটা এখানে চাউর হয়ে গেছে।’
রিকশাওয়ালার সাথে গল্প করতে করতে হরিশের বাড়ির বিশাল ফটকের সামনে পৌঁছে গেলাম। ফটক বন্ধ। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে ফটকে ঠেলা দিলাম। খুলল না। কলিংবেলও দেখতে পেলাম না। অপ্রস্তুত হয়ে খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ঘটে বুদ্ধি এল! মোবাইল ফোন বের করে হরিশকে ফোন করলাম। হরিশ বলল, 'একটু দাঁড়া। আমার সহকারী ভিনসেন্ট দরজা খুলে দেবে। ওকে সব বোঝানোই আছে। অতিথি সৎকারের সব ব্যবস্থাই ও করবে। বিশেষ কাজে এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছি। তুই খাওয়া দাওয়া করে রেস্ট নে। এই কাজটা হয়ে গেলে তোর সঙ্গে দেখা করব।’
একটুক্ষণ পরই ফটক খুলে এক দৈত্যাকার নিগ্রো ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে বলল, 'আর ইউ মিস্টার দত্ত?
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই লোকটা বলল, 'ওয়েলকাম স্যার। আই এম ভিনসেন্ট, এসিস্ট্যান্ট অব ডঃ হ্যারিস সেন। কাম ইন প্লিজ।'
আম, জামরুল, পেয়ারা গাছের বাগানের মধ্যে দিয়ে নুড়ি বিছানো লম্বা লন পেরিয়ে অন্ততঃ দুশো বছরের প্রাচীন একটা বাড়ির সামনে পৌঁছলাম। এটা হরিশের পৈত্রিক বাড়ি। সম্প্রতি বাড়িটা সংস্কার করা হয়েছে।
হরিশের সহকারী ভিনসেন্ট আমাকে দোতলার একটা ঘরে পৌঁছে দিল। এটা গেষ্টরুম। এটাস্ট বাথরুম রয়েছে। স্নান করা দরকার। স্নান করে টানা ঘুম লাগাব। সময় রয়েছে অঢেল। এই সময়ে ঘুমিয়ে নিলে ট্রেনজার্নির ক্লান্তি লাঘব হবে। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে দরকার প্রপার রেস্ট। আমি কালবিলম্ব না করে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নিলাম।
ভিনসেন্ট টিভি চালিয়ে সোফাসেটের সামনে রাখা টি-টেবিলে রিমোট কন্ট্রোল রেখে চলে গেল। এনিম্যাল প্ল্যানেট চ্যানেলে ভালুকের বিষয়ে তথ্যচিত্র চলছে। ভালুক সারা শীতকাল কেন ঘুমিয়ে থাকে, এক সাহেব তা ব্যাখ্যা করছে।
বাথরুম থেকে ফিরে এসে পরিস্কার পোশাক পরে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। তখনই দরজা নক করে ভিনসেন্ট ঘরে ঢুকবার অনুমতি চাইল। লোকটার শিষ্টাচার আছে বলতে হবে! একটা ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল ভিনসেন্ট। হট কফি, তার সাথে স্ন্যাক্স। সামান্য জলযোগে মন ভরল বটে, তবে পেট ভরল না।
বসে বসে টিভি দেখলাম খানিকক্ষণ, খানিকক্ষণ পায়চারি করলাম। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। বিরক্ত হয়ে জানলার ধারে দাঁড়ালাম। এটা দোতলা। বাড়ির পিছনের দিকটা এখান থেকে দেখা যায়। এদিকে আগাছার জংগল। একটা আম গাছ রয়েছে ব্যালকনির থেকে কয়েক ফুট দূরে। একটা ডাল ব্যালকনির এত কাছাকাছি এসে গেছে যে আশংকা হয়-- অবাঞ্ছিত কেউ ব্যালকনিতে এসে জানলার গরাদ কেটে ভেতরে না হানা দেয়! একটা পানা পুকুর। শ্যাওলা ঢাকা একটা ভাঙ্গা সিঁড়ি উঁকি মারছে। এই সিঁড়িতে, এই পুকুরের জলের তরঙ্গে তরঙ্গে না জানি কত গল্প লিপিবদ্ধ হয়েছে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে। তার কিছু গল্প যদি জানতে পারতাম তাহলে রাইটার্স ব্লকের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতাম। রবীন্দ্রনাথের ক্ষুধিত পাষাণ গল্পটা মনে পড়ে গেল। এই রকম এক অট্টালিকায় রাতের মায়ায় কথকের চোখের সামনে হারানো ইতিহাস মূর্ত হত-- অনেকটা স্বপ্নের মত, আবার ঠিক যেন স্বপ্নও নয়। আজ রাতে যদি এই প্রাচীন অট্টালিকার মুছে যাওয়া অলিখিত ইতিহাস আমার স্বপ্নে এসে ধরা দেয়, কেমন হয় তাহলে? কিন্তু বাস্তবে কী তা সম্ভব? মনে তো হয় না! যদ্দুর জানি অবচেতন মনের কল্পনা, অতৃপ্ত বাসনা-- এসবই স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। সেই সব স্বপ্ন অনেক সময় গল্পের জন্মও দেয়। “বিসর্জন” নাটকের প্রেরণা রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন একটা স্বপ্ন থেকে। স্বপ্ন দেখে গল্প লেখার অভিজ্ঞতা আমার নিজেরও হয়েছে। সেরকম একটা মির্যাকল যদি হয় তাহলে এবারের মত বর্তে যাই। গল্প দেব বলে যে সব প্রকাশকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছি, গল্প না দিতে পারলে তাঁদের কাছে বিব্রত অবস্থায় পড়তে হবে। কথা দিয়ে কথা না রাখতে পারলে, লেখক হিসেবে আমার কেরিয়ার যে ক্ষতিগ্রস্থ হবে-- তা বলা-ই বাহুল্য।
দরজায় আবার টোকা পড়ল।
'মে আই কাম ইন স্যার?' ভিনসেন্টের গলা শোনা গেল। আমার সম্মতি পেয়ে ভিনসেন্ট দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল। এবার লাঞ্চ নিয়ে এসেছে সে।
লাঞ্চে এল ডাল, সবজি, রুইমাছের ঝোল। ভিনসেন্ট জিজ্ঞেস করল আমি রেড মিট খাই কিনা। ডান হাতের ব্যাপারে আমার শূচিবায়ুগ্রস্থতা নেই। সুতরাং জানিয়ে দিলাম, চিকেন মাটন যাই হোক আমি তাতেই রাজি।
ডিনারের পর খাসা একটা ঘুম হল। ঘুম ভাঙ্গল সাড়ে চারটে নাগাদ। দেখি একদম ঘেমে গেছি। ফ্যান ঘুরছে না। পাওয়ার কাট হয়েছি কি? এই গরমের সময়ে যদি একটু ফ্যানের হাওয়া না পাওয়া যায়, তা হলেই চিত্তির! যাই হোক, বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নিলাম।
কিন্তু একটা ভাবনা আমাকে অস্থির করে তুলল। কিছুটা বিরক্তও যে হলাম না তা নয়। হরিশের সঙ্গে এখনো আমার দেখা হয়নি। ও কী এমন কাজে ব্যস্ত, যে ডেকে এনেও আমার সঙ্গে দেখা করার সময় পাচ্ছে না? হরিশের ব্যবহারটা আমার ঠিক মনঃপুত হল না।
ইভিনিং ওয়াকের অভ্যাস আছে আমার। বাড়ির কাছের পার্কে রোজ কিছুক্ষণ পায়চারি করে হাওয়া না খেতে পারলে আমার শরীর ও মন-- কোনওটাই ঠিক ভাল থাকে না। এই মুহূর্তে অন্ততঃ ছাদে গিয়ে চারিদিকের দৃশ্য দেখতে পারলেও একঘেয়ে ভাবটা কাটবে। অগত্যা, ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। লম্বা একটা প্যাসেজ। আগেই দেখেছিলাম এই প্যাসেজ পেরিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ি। প্যাসেজে লাইটগুলো জ্বলছে না। প্যাসেজের পাশের ঘরটার দরজা খোলা। সেখান দিয়ে হালকা একটু আলো এসে পড়েছে প্যাসেজের মেঝের উপর। ভিনসেন্ট বলেছিল ওই ঘরটা হরিশের ল্যাবরেটরি।
হঠাৎ একটা শব্দ পেলাম। মনে হল কাঁচ ভাঙার শব্দ। তারপরই যে শব্দটা ছুটে এল তাকে গর্জন ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। কিন্তু কিসের গর্জন? এরপরই মনে হল কিছু যেন আছড়ে পড়েছে মেঝের উপর। কোনও এক অজানা ভাষায় ভিনসেন্টের চিৎকার শোনা গেল। সেই চিৎকার ছাপিয়ে আবার এক গর্জন, আর তারপরই ধুপধাপ করে ক্রমবর্ধমান আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। ল্যাবরেটরির খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসছে কালো লোমশ এক প্রমাণ আয়তনের ভালুক। ভালুকটা আমাকে সামনে দেখে আবার একটা হুঙ্কার ছাড়ল। প্রবল গতিতে ছুটে এল আমার দিকে। আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম, অথবা গোটা ঘটনা এতই দ্রুত ঘটল যে পিছন ফিরে দৌঁড় দেবার কথাও মনে এল না। প্রাণীটা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বার পূর্ব মুহূর্তে হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেলাম। নিয়মিত শরীর চর্চা করি। তাই প্রতিবর্তক্রিয়ায় সাড়া দিয়ে প্রাণীটাকে পাশ কাটিয়ে নিজেকে কোনমতে রক্ষা করতে পারলাম। প্রাণীটা বিফল হয়ে আরো ক্রুদ্ধ হয়ে আবার আমার দিকে ছুটে এল। কিন্তু তখনই “দুম” করে একটা শব্দ হল আর ভালুক-বাবাজি ছটফট করতে করতে করতে নেতিয়ে পড়ল। তাকিয়ে দেখি, খানিকটা দূরে tranquillizer gun হাতে হরিশ দাঁড়িয়ে আছে।
মোক্ষম সময়ে ঘুম পাড়ানি গুলি করে ভালুকটাকে যদি বিকল করা না যেত তাহলে আমার অবস্থা যে কী হত তা ভাবলেও শিউরে উঠছি। দীর্ঘদিন বাদে হরিশের সঙ্গে মোলাকাত হল, তাও এই রকম একটা ভয়ংকর পরিস্থিতিতে! গোটা ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে হরিশ বলল, 'কিছু মনে করিস না। আমার বাড়িতে এসে তোকে বিপদে পড়তে হল। এর জন্য আমার আফশোসের শেষ নেই। বোধহয় তোকে এই বিপজ্জনক পরিবেশে ডেকে আনাই আমার উচিত হয়নি।'
'কি যে বলিস!’ আমি বললাম, ‘এ একটা নতুন অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা বেঁচেই তো খাই। চিন্তা করিস না। আমার গায়ে সামান্য আঁচোড়ও লাগেনি।'
'কিন্তু খুব বড় একটা ফাঁড়া কাটল তোর।'
'সে তো বটেই আরেকটু হলেই ভালুকের পেটে যেতে হত আমাকে! কিন্তু ও রকম একটা বুনো জানোয়ার তোর বাড়িতে কেন? ব্যবচ্ছেদ করবি নাকি? সাপ-ব্যাঙের ডাক্তার হয়ে সাধ মেটেনি? এখন ভালুকের ডাক্তার হতে চাইছিস?'
কথাগুলো বললাম খানিকটা মস্করার ছলেই। তবে সেই রঙ্গের মধ্যে যে খানিকটা ব্যঙ্গ ছিল না তা নয়। কারণ একটুক্ষণ আগে যে বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম তাকে “নতুন অভিজ্ঞতা” বলে স্বাগত জানালেও হরিশকে আমি মন থেকে ক্ষমা করতে পারিনি। ওর কি আগে থেকে আমাকে সাবধান করা উচিত ছিল না?
আমার কথায় হরিশ যে খুশি হল না তা তার মুখ দেখেই বোঝা গেল। তার মুখের অভিব্যক্তিতে কিছুটা যেন বিরক্তি মিশে গেল আমার কথা শুনে। বুঝলাম, আমি আর আগের হরিশকে পাব না। আগে হরিশ হাসিখুশি ও প্রাণোচ্ছল ছিল। ও যদি আগের মত থাকত, তাহলে আমার পরিহাসকে হয়ত হেসেই উড়িয়ে দিত। কিন্তু এখন তার মুখ ভয়ানক রকম গম্ভীর। আমার বিষম খটকা লাগল। এই কয় বছরের মধ্যে কী এমন হল যে ও এমন অন্তর্মুখী হয়ে পড়েছে?
হরিশ গম্ভীর মুখে ভিনসেন্টকে আমার অজ্ঞাত কোনও এক ভাষায় কী সব বলল। কী বলল তা বুঝলাম না বটে, তবে আমার ধারণা, ভিনসেন্টকে হরিশ বকুনি দিল। আর তাতে ভিনসেন্টের কালো মুখখানা হয়ে গেল পাথরের মত থমথমে। অচেতন ভালুকটাকে সে টানতে টানতে ল্যাবরেটরির দিকে নিয়ে গেল অবশেষে।
পরিবেশটাকে হালকা করার জন্যে বললাম, 'আচ্ছা, তোকে লোকে সাপ-ব্যাঙের ডাক্তার বলে ডাকে কেন বলত?'
'মুর্খ লোকেরাই ওটা বলে।' ফোঁস করে উঠল হরিশ। তারপর কপাল চাপড়ে বলল, 'আমার ভাগ্যই খারাপ। যা করতে যাই তাতেই কোন না কোন বাধা এসে পড়ে। আমার প্রতিভার কেউ কদর করল না রে ভাই!' একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল হরিশের অন্তঃস্থল থেকে।
সেদিন রাতে ডিনারের সময় দেখলাম হরিশ বেশ ফুর্তিতেই আছে। হরিশের বাবুর্চি আহামরি কিছু রান্না না করতে পারলেও একেবারেই তা অখাদ্য নয়। মুরগীর মাংস আর রুটি দিয়ে ডিনার করতে করতে হরিশ বলল, 'তোকে কেন ডেকেছি আন্দাজ করতে পেরেছিস?'
'তুমি না বললে কী করে জানব?' জবাব দিলাম।
'আচ্ছা আমাকে দেখে তোমার কী মনে হয়?'
'আমি জানি তুমি একটা বড় মাপের বৈজ্ঞানিক।'
'ভুল। আমি একটা ব্যর্থ বৈজ্ঞানিক।'
শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম হরিশের মানসিক স্বাস্থ্য মোটেই ভাল নেই। হতাশাবোধে ভুগছে সে।
'আমিও সফল হতে পারতাম, কিন্তু আমাকে সফল হতে দিল না।'
'কে দিল না?'
'আমার ভাগ্য। ভুলটা আমারই, বুঝলে? একটা জার্মান মেডিসিন সংস্থায় রিসার্স ফেলো হিসেবে চাকরি করতাম। আমার গবেষণার বিষয় ছিল কী করে আল্প সময় ঘুমিয়ে বেশি সময় ঘুমের সুফল পাওয়া যায়। সুস্থ্য স্বাভাবিক একটা মানুষ যদি দিনের তিনভাগের একভাগ সময় অর্থাৎ আট ঘন্টা ঘুমায়, আর যদি লোকটা ৭২ বছর বাঁচে, তাহলে জীবনের ২৪টা বছরই তার ঘুমিয়ে কাটবে। অর্থাৎ জীবনের একটা বড় অংশই নষ্ট।’
‘ঠিকই বলছ বটে।’ সমর্থন না করে পারলাম না, ‘ঘুমালেই সময় নষ্ট, কাজকর্ম সিকেয়। কিন্তু না ঘুমালেও তো চলে না। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করে।’
‘এখন ধরো, যদি ঘুমের সময়টাকে আট ঘন্টার জায়গায় এক অতিরিক্ত সময় পাবে। তাতে সে অনেক বেশি কাজ করতে পারবে। গবেষণার বিষয়টা দারুণ তাই না? গবেষণার কাজ শেষ হয়ে গেছিল। শুধু গবেষণা পত্র জমা দেওয়াই বাকি। এমন সময় একদিন দেখি আমার দেরাজ থেকে গবেষণাপত্র উধাও। পুলিশ কোন কুল কিনারা করতে পারল না। শাস্তি হিসেবে আমাদের সংস্থা আমাকে স্যাক করল। সংস্থা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করল, আমি নিজেই নাকি গবেষণাপত্র অন্য কোন সংস্থার কাছে বেচে দিয়েছি। অভিযোগ প্রমানিত হল না বটে তবে কলংক একবার লাগলে সহজে মোছা যায় না। জার্মানিতে অন্য কোন সংস্থায় চাকরিও জুটল না। অবশেষে নিজের দেশেই ফিরে আসতে হল। টাকা পয়সা ভালই জমানো ছিল। ছিল বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার। নতুন করে এখানে গবেষণার কাজে লেগে পড়লাম।'
অনেকক্ষণ থেকেই একটা প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। প্রশ্নটা করেই বসলাম এবার, 'তোর মিসেস কে দেখছি না। কেমন আছে সে?'
হরিশ প্রশ্নটা শুনে কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর মুখ খুলল সে। নির্লিপ্তভাবে বলল, 'থাক পুরনো কথা তুলে আর কী হবে? দ্যাটস এ ক্লোজড চ্যাপ্টার।'
আবার খটকা লাগল আমার। হরিশ তার স্ত্রীকে ক্লোজড চ্যাপ্টার বলছে কেন? ওর স্ত্রী ওর সঙ্গে থাকে না, সেতো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কারণটা কী? বিয়ে কি ভেঙে গেছে? নাকি হরিশের স্ত্রী আর বেঁচেই নেই? এই সব প্রশ্ন করে হরিশকে বিরক্ত করতেও মন চাইছে না, আবার প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শান্তিও পাব না। স্বাভাবিকভাবেই আমার অস্বস্তিভাবটা বাড়তে লাগল।
খাওয়া দাওয়ার পর হরিশ আমাকে তার ল্যাবরেটরি ঘুরে দেখাল। তখনই জানতে পারলাম হরিশকে সাপ-ব্যাঙের ডাক্তার কেন বলা হয়।
একটা বড় খাঁচার মধ্যে এখন ভালুকটা ঘুমাচ্ছে।
ল্যাবরেটরির মধ্যে বড় একটা কাচের বাক্স রাখা ছিল। সেটা এখন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। হরিশ জানাল, এই বাক্সটার মধ্যেই ভালুকটাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল। কাচের বাক্সটায় ভালুকটাকে রেখে তাপমাত্রা হিমাংকের কাছাকাছি রাখা ছিল। কিন্তু আজ বাড়িতে একটা শর্টসার্কিট হয়। মেইনসুইচে আগুন জ্বলে গিয়েছিল। কাচের বাক্সের মধ্যে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। ভালুকটা ঘুম থেকে উঠে বাক্স ভেঙে বেরিয়ে আসে।
হরিশ বলল, 'তুমি নিশ্চয়ই জানো, চার প্রজাতির ভালুক শীতঘুম দেয়। আমেরিকান ব্ল্যাক বিয়ার, এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার, ব্রাউন বিয়ার আর পোলার বিয়ার। এদের শীতঘুম সঠিক অর্থে “হিবারনেশন” নয়। ঠাণ্ডার সময়ে এদের বডি-টেমপেরেচার খুব একটা কমে না, যে কোন সময়ই এরা শীতঘুম থেকে উঠে পড়তে পারে। শীতের সময়টা এরা ঘুমিয়ে কাটায়। খাওয়া দাওয়ার দরকার পড়ে না। শরীরে যে চর্বি জমা থাকে সেই চর্বি ভেঙেই তখন বেঁচে থাকার শক্তি পাওয়া যায়। হার্ট বিট রেট কমে যায়, ফলে শক্তি খরচও কমে। ভালুকের হার্টবিট রেট মিনিটে ৪০ থেকে ৫০ বার। শীতঘুমের সময় সেই রেট কমে দাঁড়ায় মিনিটে ৮ বারের মতন। এই ভাবে এরা টানা ১০০ দিনও ঘুমিয়ে থাকতে পারে। ভালুকের মতন মানুষও ম্যামেল, উষ্ণ রক্তের প্রাণী, অথচ মানুষ এ-রকম পারে না।”
বললাম, “মানুষের শীতঘুম দেবার দরকারটাই-বা কী? কোনও প্রয়োজন আছে কি?”
“হিবারনেশন একটা ক্ষমতা। পাখির ওড়া দেখে মানুষও উড়তে চাইল। তৈরী হল এরোপ্লেন। তাহলে শীতঘুম শিখলে ক্ষতি কী? প্রতিকূল পরিবেশ, খাবারেরও অভাব। ব্যাস ঘুমিয়ে পড়লেই হল। মাসের পর মাস কাটিয়ে দাও নির্ভাবনায়।”
'তুমি কি এখন শীতঘুম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছ?' জিজ্ঞেস করলাম।
'উহুঁ, হিবারনেশন, হিবারনেশন। ওটার প্রতিশব্দ পার্ফেক্টলি শীতঘুম নয়। তবে ব্যাপারটা শীতকালে হয় বলে শীতঘুম বলতেও পারো।”
'সাপ, ব্যাঙ— এই সব ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণীরা শীতকালটা ঘুমিয়ে কাটায় তা জানি।’ বললাম আমি, ‘তবে, ভালুকেও শীত ঘুম দেয় জানা ছিল না।'
'আরো অনেক প্রাণীরই এটা একটা সারভাইভিং কৌশল। এমনই কৌশল, যার প্রভাবে দীর্ঘদিনের অনাহারেও দিব্যি টিকে থাকা যায়। ম্যাডাগাসকরের মোটা লেজ ডোয়ার্ফ লেমুরের কথাই ধরো। ওখানে জুন-জুলাই মাসে উষ্ণতা থাকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মত। আমাদের কাছে এই আবহাওয়া গরম। কিন্তু লেমুরদের কাছে ওটাই দুঃসহ ঠাণ্ডা। এই সময় লেমুরেরা গাছে আশ্রয় নিয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে প্রায় সাত মাস কাটিয়ে দেয়। নভেম্বরে বৃষ্টি শুরু হয়। খাদ্য সংকট কাটে। সেই সময় লেমুরদের ঘুম ভাঙে। এই সাত মাস বেঁচে থাকার জন্য শক্তি কোথা থেকে পায়? লেজে জমানো চর্বি থেকে। চর্বি ক্ষয় হয় বলে ঘুমের শেষে ওদের শরীরের অর্ধেক ওজনই কমে যায়।’
‘কোল্ড ব্ল্যাডেড প্রাণীদের ক্ষেত্রে কী হয়?’
‘হিবারনেটের সময় ওদের মেটাবলিক রেট কমে যায়। হার্টবিট কমে যায়। শক্তি খরচ হয় মিনিমাম।’
তাকের উপর সাজানো রয়েছে বেশ কয়েকটা কাচের জার। জারের মধ্যে রাখা আছে নানান ধরণের সাপ। কোনওটায় আবার রাখা আছে ব্যাঙ। কোনওটায় রাখা অন্য কোন প্রাণী। সব জার গুলোই ছিদ্র বিশিষ্ট মুখ দিয়ে আটকানো রয়েছে।
হরিশ বলল, 'এই প্রাণীগুলো প্রত্যেকটা অন্তঃত টানা দু-বছর ধরে ঘুমাবে।'
'বল কী? দু-বচ্ছর না খেয়ে থাকবে?' বিষ্মিত না হয়ে পারলাম না।
'আমার তৈরী একটা কেমিক্যাল ওদের শরীরে ইঞ্জেক্ট করে দিয়েছি। দেখতেই পাচ্ছ ওদের কোন ঠাণ্ডা যায়গাতে রাখা হয়নি। তবু ওরা ঘুমাচ্ছে। তারমানে শীতল রক্তের প্রাণীদের ক্ষেত্রে আমার গবেষণা সফল। এখন উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের হিবারনেশনে পাঠাবার জন্যে চেষ্টা করছি। কিন্তু বার বার ব্যর্থ হচ্ছি। ব্যর্থতার একটা নমুনা তো নিজের চোখেই দেখলে। আমার ওষুধ ঠিক ঠাক কাজ করলে গরম পরিবেশেও ভালুকটার ঘুম ভাঙত না।'
সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে সহজে ঘুম এল না। এপাশ ওপাশ করতে লাগলাম। নানা রকমের পরস্পর বিরোধী চিন্তার উদয় হতে লাগল। হরিশকেও রীতিমত রহস্যময় বলে মনে হতে লাগল। ঘুম নিয়ে গবেষণা করছে লোকটা। দীর্ঘদিন ধরে ঘুম পাড়িয়ে রাখার উপায় ও করায়ত্ব করতে চাইছে। কিন্তু কেন? উদ্দ্যেশ্য কী লোকটার? ই-মেল পাঠিয়ে আমাকেই-বা কেন ডেকে এনেছে সে কথাও সে পরিস্কার করে বলেনি। পুরনো বন্ধুর সঙ্গ পাওয়াই কি ওর উদ্যেশ্য? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো অভিষন্ধি?
এই সমস্ত ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। আমার ঘুম খুবই পাতলা। তার উপর দুপুরে ভাল ঘুমিয়েছিলাম। ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। মনে হল কেউ দরজা খুলল। তন্দ্রা ভেঙে তাকিয়ে দেখি জলন্ত মোমবাতি হাতে করে দরজা দিয়ে কে যেন ঢুকছে। বেড সুইচ টিপে লাইট জ্বালাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু জ্বলল না। আবার পাওয়ার ফেইলিওর না কি? মৃদু কণ্ঠে বললাম, 'কে?'
কোনো জবাব এল না। আগন্তুক অতি সাবধানে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। মোমবাতির মৃদু আলোয় বোঝা গেল আগন্তুক এক মহিলা। আমার খাটের কাছে এসে থামল। মোমবাতির আলোয় ভদ্রমহিলার মুখ এখন দেখা যাচ্ছে। এই মুখ আমার চেনা। বৈঠকখানায় হরিশের সঙ্গে এই মহিলারই জয়েন্ট ফোটো রয়েছে। ইনি হরিশের স্ত্রী মার্টিনা।
আমি ধড়মড় করে উঠে পড়ে বললাম, 'কি ব্যাপার? এত রাতে আপনি?'
মার্টিনা নিজের ঠোঁটে তর্জনি রেখে 'স্স্স্...' শব্দ করে আমাকে চুপ করতে ইশারা করল, তারপর আমার কাছে এসে ভাঙা ভাঙা বাঙলায় ফিসফিস করে বলল, 'বাঁচতে চাইলে পালান। আপনি জানেন না কী বিপদ অপেক্ষা করে আছে আপনার জন্য। এখোনো সময় আছে পালান।'
'কিন্তু...'
'কোনো কিন্তু নয়। আপনি জানেন না আপনার বন্ধু পাগল হয়ে গেছে। ওর পাগলামিতে আমার যা হাল হয়েছে আপনারও তাই হতে চলেছে। পালান আপনি। পালান।'
'কী হয়েছে আপনার?'
মার্টিনা কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর বলল, 'খুব বিপদ। খুব বিপদ। আপনাকে সব কিছু বোঝানোর সময় নেই। আপনি বরং আমার সঙ্গে আসুন। আপনাকে কিছু দেখাবার আছে। নিজের চোখে সে সব দেখলে বিপদটা কী টের পাবেন।'
মার্টিনা দরজার দিকে পা বাড়াল।
আমি হতবুদ্ধি হয়ে বসে রইলাম। মার্টিনা হরিশের সঙ্গেই থাকে। কিন্তু হরিশ ওকে ক্লোজড চ্যাপ্টার বলছিল কেন? এতক্ষণ এই বাড়িতে আছি, তবু ওর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়নি-ই-বা কেন? এখন হঠাৎ সামনে এসে আমাকে কোন বিপদ থেকে সাবধান করছে সে?
মার্টিনা দরজার কাছাকাছি পৌঁছে আমার দিকে মাথা ঘোরাল। আমি তখনও খাটের উপরই বসে আছি। মার্টিনা হাতছানি দিয়ে ডাকল আমায়। বুঝলাম সময় খুবই কম। মার্টিনা আমাকে কী দেখাতে চাইছে সেই বিষয়েও কৌতুহল হচ্ছে। তাই মন্ত্রমুদ্ধের মত আমি মার্টিনার পিছু পিছু চলতে লাগলাম।
মার্টিনা চলেছে ল্যাবরেটরির দিকে। দরজা ঠেলা দিতেই দরজা খুলে গেল। মার্টিনা ল্যাবরেটরির ভীতরে ঢুকল। আমিও তাকে অনুসরণ করলাম। মার্টিনার হাতে ধরা মোমবাতির কোমল আলোয় ল্যাবরেটরি আরো বেশি রহস্যময় লাগছে। মোমবাতির আলো থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। ফলে ল্যাবরেটরির মধ্যের যন্ত্রপাতি, আসবাব, জ্যান্ত, মৃত ও ঘুমন্ত জীবজন্তুর ছায়াগুলোও স্পন্দিত হয়ে একটা আধি-ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। বুকের মধ্যে ঢিপ-ঢিপ শব্দটা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
ভালুকের খাঁচা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে মার্টিনা। কিছুটা দূরে অন্য একটা দরজা দেখা যাচ্ছে। সেই দরজার সামনে মার্টিনা থামল। এই দরজাটা তালাচাবি দিয়ে বন্ধ, আগেও এই দরজাটাকে তালাবন্ধ থাকতে দেখেছিলাম। এই ঘরের মধ্যে হরিশ আমাকে নিয়ে যায়নি।
'ওই দেরাজে চাবি রাখা আছে, দরজাটা খুলুন।' বলল মার্টিনা।
দেরাজ খুলে টুকিটাকি কিছু জিনিসপত্রের মধ্যে একটা মরচে ধরা চাবি দেখতে পেলাম।
তালাটাতেও মরচে ধরেছে। অনেক কসরত করে তালা খুলতে হল। বোধ হয় এই তালা বহুদিন খোলা হয়নি।
তালা খুলে অতি সাবধানে দরজাটায় ঠেলা দিলাম। কব্জায় ক্যাচ করে শব্দ তুলে দরজাটা হাট হয়ে খুলে গেল।
'ঘরের ভিতরে চলুন।' মার্টিনার নির্দেশ এল আমার পিছন থেকে। আমি ঘরের ভিতরে এলাম। আমার পিছনে পিছনে মার্টিনাও ঘরের ভিতরে এল।
ঘরটা খুবই ছোট। ঘরের মাঝখানে একখানা লম্বা চ্যাপ্টা বাক্স। মার্টিনা বাক্সের ডালা খুলতে বলল।
বাক্সের ডালা খুলতেই শিউরে উঠলাম। হাত পা যেন অবশ হয়ে এল আতংকে।
বাক্সের মধ্যে একটা নর-কংকাল। কংকালের গলায় একটা মুক্তর মালা। সেই মালার লকেটটা আগেও দেখেছি। দেখেছি মার্টিনার ছবিতে।
আৎকে উঠে কফিন থেকে কয়েক পা পিছিয়ে আসতেই কোনো কিছুতে বাধাপ্রাপ্ত হলাম আমি। ঘুরে দেখি, দৈত্যাকৃতি বপু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভিনসেন্ট। মোমবাতির আলো নয়, ল্যাবরেটরি থেকে আগত বৈদ্যুতিক আলোর ভগ্নাংশ কখন যে মোমবাতির আলোকে প্রতিস্থাপিত করেছে বুঝতেই পারিনি। মার্টিনাকেও আর দেখতে পেলাম না।
ভিনসেন্টের বলিষ্ঠ হাতে আমি বন্দি হয়ে গেলাম। নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করলাম প্রাণপণে। কিন্তু ভিনসেন্টের আসুরিক শক্তির সঙ্গে পেরে উঠব কেন? ঠিক সেই সময় বাম হাতে হঠাৎ একটা তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম। ইঞ্জেকশনের সূঁচ ফুটিয়ে দিয়েছে হরিশ। একটা অদ্ভুত হিংস্র হাসি খেলা করছে তার মুখে জুড়ে। ধীরে ধীরে আমার শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগল। চোখে নেমে এল অন্ধকার।
'ওয়েক আপ ম্যান ওয়েক আপ...'
কথাগুলো যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে।
'ওপেন ইয়োর আইজ ম্যান...'
ঢেউয়ের পর ঢেউ যেমন ধেয়ে আসে, তেমনি নির্দেশের পর নির্দেশ এসে আছড়ে পড়ছে আমার ক্রমস্ফুটমান চেতনার সৈকতে।
অতি কষ্টে চোখ খুললাম। চড়া আলো। সহ্য করতে পারলাম না। প্রতিবর্ত ক্রিয়াতেই বন্ধ হয়ে গেল আমার চোখ।
'ইয়োর নেম প্লিজ?'
নাম বলতে গিয়ে দেখি জিভ নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে। কোন মতে আড়ষ্টভাবে নিজের নাম বললাম।
আজানা একটা ভাষায় দু-জন লোক কী যেন বলাবলি করতে লাগল। কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারলাম তারা কারা।
'নীলু, আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস? তোর ঘুম ভেঙেছে।' হরিশ বলল।
আমি আবার চোখ খুললাম। উজ্জ্বল আলোতে ধীরে ধীরে আমার চোখ সয়ে এল। দেখলাম হরিশ আমার উপর ঝুঁকে পড়েছে। হরিশের চোখে মুখে একটা প্রশান্তির ভাব।
'তোকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারছি না। তুই আমার খুব উপকার করেছিস। তুই আমার নিমন্ত্রন গ্রহণ করেছিলি বলেই আমার ঘুমপাড়ানি ওষুধটা মানুষের উপর প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমাকে পাগল ভেবে আমার ধারে কাছে কেউ ঘেঁসে না। তুই আমার উপর বিশ্বাস রেখেছিলি বলে আমি তোর উপর কৃতজ্ঞ।'
আমি উঠে বসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। নিজেকে খুব দুর্বল মনে হল।
হরিশ বলল, 'তুই টানা দু-বছর ঘুমিয়েছিস। বাইরে থেকে লিকুইড ফুড ইঞ্জেক্ট করা হয়নি। ব্রেন, হার্ট সব কিছুর গতি এতই মন্থর ছিল যে এনার্জি সাপ্লাইয়ের দরকারও পড়েনি। একদম পার্ফেক্ট হিবারনেশান যাকে বলে, তুই টানা দুই বছর সে-ভাবেই কাটিয়েছিস। সাপ কিংবা ব্যাং যেভাবে শীত ঘুম দেয় ঠিক সেইরকম ভাবেই তোর শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ চলেছে। আমার গবেষণা সফল। এবার আর কারুকে আত্মহত্যা করতে হবে না। কেউ যদি জীবনের উপর আশা হারায় তাহলে একটা ইঞ্জেকশনে তাকে ঘুমপাড়িয়ে দেওয়া যাবে। কষ্ট করে মরতে হবে না, আবার বেঁচে থেকে কষ্টও পেতে হবে না। দারুণ যুগান্তকারী একটা আবিস্কার। তাই না?'
কোন উত্তর দিতে পারলাম না। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না হরিশের কথাগুলো। আমি টানা দু-বছর ঘুমিয়েছি? বলে কী হরিশ? তা যদি হয়, তাহলে বলতে হয় হরিশ আমার জীবন থেকে দু-বছর কেড়ে নিয়েছে। আমার বাবা-মা-স্ত্রী-পুত্র সব কেমন আছে কে জানে? আমার অনুমতি ছাড়া আমার উপর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করে হরিশ চরম অন্যায় করেছে। হরিশ আমার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। ওকে আর বন্ধু বলে ভাবার কারণ নেই। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এই অন্যায়ের শোধ আমি তুলবই।
'এখন তোকে অজ্ঞান করব।' হরিশ বলল, ‘বেশিক্ষণের জন্য নয়। পাঁচ-ছয় ঘন্টার জন্য। তোর শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা পরীক্ষা করে দেখব। এতদিন কিছু খাওয়া হয়নি। তাই এনার্জিরও ঘাটতি আছে। আশা করি কয়েক দিনের মধ্যে তোকে ছুটি দিতে পারব।'
হরিশের কথায় মুক্তির আশায় আমার আনন্দিত হবার কথা ছিল। কিন্তু তেমন অনুভুতি আমার হল না। বরং চোখের সামনে বিদ্যুত চমকের মতন আকস্মিকভাবে একটা ছবি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। একটা বাক্স। তার মধ্যে একটা কংকাল। কংকালের গলায় একটা মুক্ত মালা। মালায় একটা লকেট। কংকালটা যেন দাঁত বের করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। উফ্ কী বীভৎস। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, 'ওটা কার কংকাল?'
হরিশ আমার মুখের উপর ইথার মাস্ক চেপে ধরে বলল,
'ওটা ক্লোজড চ্যাপ্টার। তবে ওর অবদানটাও ভুলবার নয়। আমার ওষুধে কিছু সমস্যা ছিল। তাই ও সহ্য করতে পারেনি। কিন্তু আমি ওকে ভুলিনি, নিজের কাছে যত্ন করে রেখেছি। শত হলেও সহধর্মিণী বলে কথা।'
ধীরে ধীরে হরিশের কথা অস্পষ্ট হতে লাগল। বুঝলাম, আমার চেতনা লুপ্ত হচ্ছে।
পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙল। শরীরে কোন ব্যথা নেই, তবে মাথায় অত্যন্ত যন্ত্রনা হচ্ছে। চোখ খুললাম। ঘর অন্ধকার হলেও সেই অন্ধকার গাঢ় নয়। জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। আকাশের কালো রং ফিকে হয়ে গেছে। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। উঠে বসলাম। চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, ল্যাবরেটরি থেকে আমাকে স্থানান্তরিত করে গেষ্ট রুমে রাখা হয়েছে।
আমাকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কি অবশেষে শেষ হয়েছে? হরিশ কী আমাকে বাড়ি ফিরতে দেবে? না কি আমাকে এখানে বন্দি করেই রাখবে? হরিশ বলেছিল আমাকে ছুটি দেবে। আমাকে মুক্তি দেবে এমন প্রতিশ্রুতি সে দেয়নি। তাহলে আমার করনিয় কী? হরিশের উপর আর বিশ্বাস করা চলে না। ও বদ্ধ উন্মাদ। খুনিও নিশ্চয়। ওর স্ত্রী মার্টিনা ওর অদ্ভুত গবেষণার বলি হয়েছে। আরো কত লোক ওর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কে জানে? নাহ্! এর একটা প্রতিকার করা নিতান্তই দরকার।
উঠে দাঁড়ালাম। এখান থেকে পালাতে হবে। এটাই সুযোগ। কিন্তু পালাব কোন পথে?
ঝুলবারান্দায় এলাম। সেই আম গাছটা আর তার সেই ডালটা এখনো আছে। ডাল ধরে ঝুলে পড়ে গাছের কান্ডের কাছে পোঁছে গেলাম। গাছ বেয়ে নেমে এলাম নীচে। মনে পড়ছে পুকুরের ধারে পাঁচিলের খানিকটা অংশ ভাঙা আছে।
ভাঙা পাঁচিল টপকে অন্য পাশে লাফিয়ে পড়লাম। এটা একটা ফসলের ক্ষেত। ক্ষেতের আল ধরে অন্ততঃ মাইল খানেক হেঁটে এসে বড় রাস্তায় যখন পোঁছলাম তখন দিগন্ত রেখায় সূর্যের আভাস দেখা যাচ্ছে। লোকজনও রাস্তায় নেমেছে। ধারে কাছে পুলিশ স্টেশন আছে তা জানতাম। লোকমুখে দিক নির্দেশ শুনে পুলিশ স্টেশনে এসে পৌঁছলাম।
দারোগাবাবু টেবিলের উপর পা তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে হাই তুলছেন, আর একপাশে এক কনস্টেবল বসে বসে ধুমপান করছে। আমি জোর গলায় আওয়াজ ছাড়লাম, 'নমস্কার স্যার।'
আমাকে দেখে দারোগাবাবু টেবিল থেকে পা নামিয়ে উঠে বসলেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন, 'হ্যাঁ বলুন, কী দরকার?'
আমি দারোগাবাবুকে সমস্ত বৃত্তান্ত খুলে বললাম।
দারোগাবাবু সব শুনে ফাইল লিখতে লিখতে বললেন, 'আচ্ছা আপনি হরিশবাবুর বাড়িতে কত তারিখে গিয়েছিলেন মনে পড়ছে?'
'মনে পড়ছে। তারিখটা ছিল, ২রা সেপ্টেম্বর ২০১২।'
দারোগা বাবুর লেখা থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে নিষ্পলকে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর উঠে দাঁডিয়ে আমাকে বললেন, আপনি একটু বসুন। আমি এক্ষুনি আসছি।'
দারোগাবাবু পাশের ঘরে গেলেন। খানিকক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, 'আপনি একটু জল খাবেন?'
তেষ্টা পাচ্ছিল। টেবিলে রাখা জল ভর্তি গ্লাসটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন তিনি। থানাতে এসে এতটা মানবিক ব্যবহার পাবো স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি।
ডায়রি লেখা বন্ধ করে দারোগাবাবু আমাকে নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমার বাড়ি কোথায়, আমার পেশা কি, পরিবারে কে কে আছে—ইত্যাদি ইত্যাদি! আমাকে এইসব প্রশ্ন করা তাঁর পেশাগত বাধ্যবাধকতা। কিন্তু একটা সময় আমার মনে হল, দারোগাবাবু আমার সঙ্গে খোসগল্প করছেন। ঠিক যেন টাইমপাস। ভদ্রলোক অমায়িক সন্দেহ নেই, কিন্তু তিনি এফ.আই.আর লেখা বন্ধ করলেন কেন? এই প্রশ্নটা আমাকে বিব্রত করল।
দারোগাবাবুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে কতক্ষণ কেটেছে বুঝতে পারিনি, হঠাৎ দেখি ঘরের মধ্যে দুজন সাদা পোশাকের লোক ঢুকল। দারগাবাবুকে তারা ইশারায় কিছু জিজ্ঞেস করল। দারোগাবাবু আমার দিকে তর্জনি তুলে বললেন, 'হ্যাঁ, ইনিই।'
কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকদুটো হঠাৎ আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমাকে শক্ত করে চেপে ধরে আমার মুখে চেপে ধরল একটা রুমাল। একটা মিষ্টি গন্ধ। আমার শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগল। জ্ঞান হারাবার আগে বুঝতে পারলাম, লোকদুটো আমাকে থানার বাইরে দাঁড় করানো একটা কালো রঙের গাড়িতে তুলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
জ্ঞান ফেরার পর আবিস্কার করলাম, আমার একটা পা লোহার শিকল দিয়ে চৌকির সংগে বাঁধা। পাশে দাঁড়িয়ে সাদা অ্যাপ্রন পরা এক ভদ্রলোক দারোগাবাবুকে কী যেন বলছে অত্যন্ত নীচু স্বরে। তার কিছু কিছু কথা কানে এল।
'এই ব্যাপারটা রেয়ার নয়। অত্যধিক মানসিক চাপ, কিংবা কোন বিষয়ে অত্যধিক চিন্তাভাবনার ফলে অনেক সময় মস্তিস্কে ক্যামিক্যাল ইমব্যাল্যান্স হতে পারে। এ রকম কেসে, রোগী নানা রকম স্বপ্ন দেখে, ঘুম ভাঙার পর সেই স্বপ্নগুলোকে সত্যি বলে মনে হয়। আর ইনি তো রাইটার। কল্পনাবিলাসী!”
***
অবশেষে রাইটার্স ব্লক কাটল। হরিশের বাড়ি যাবার পর থেকে যা যা অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম সবটাই একটা গল্প হয়ে উঠল। গল্পটা প্রকাশিত হবার পর প্রশংসাও জুটল মন্দ না। তবে গল্পের যে আরো কিছুটা বাকি আছে তা পরে বুঝেছিলাম।
মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার পর, বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। একদিন ক্যুরিয়ারের মাধ্যমে একটা পার্সেল পেলাম। পার্সেলের মধ্যে ছিল একটা খবরের কাগজের কাটিং আর একটা চিঠি। হরিশের চিঠি। হরিশ লিখেছে,
"প্রিয়ভাজনেসু,
যখন তুমি এই চিঠি পাবে, তখন আমি অনেক দূরে থাকব। চরম হতাশা নিয়ে দেশে ফিরেছিলাম। নতুন করে আবার শুরু করার চেষ্টা করেছিলাম। তবু কাজে মন বসাতে পারতাম না। নিঃসঙ্গতা আমাকে পেয়ে বসেছিল। মনে হত পুরনো বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সময় কাটাতে পারলে আমি হয়ত হারিয়ে যাওয়া জীবনের ছন্দ আবার ফিরে পাব। একদিন একটা বাংলা সংবাদপত্রে তোমার একটা আর্টিক্যাল পড়লাম। আর্টিক্যালের নীচে তোমার ই-মেইলটাও দেওয়া ছিল। পুরনো বন্ধুতা নতুন করে ঝালিয়ে নেবার ইচ্ছে হল। সেই কারণে নেহাত ঝোঁকের বশে আমার বাড়িতে তোমাকে আমন্ত্রণ করেছিলাম। কিন্তু আমার ভাগ্যই খারাপ। আমাকে তুমি ভুল বুঝলে। আমার বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করলে। আর পুলিশও আমাকে অযথা হয়রান করল, তারপর মোটা টাকা ঘুষ আদায় করে রেহাই দিল। যাই হোক তোমাকে একটা সংবাদ জানাই, আমার গবেষণাপত্র কে চুরি করেছিল অবশেষে জানতে পেরেছি। সত্যিটা না জানলেই ভাল হত। সেটা ক্লোজড চ্যাপ্টার। আসলে অযাচিত বিশ্বাসঘাতকতা হৃদয় ভেঙে দেয়। এতদিনে বুঝেছি অর্থ, প্রতিপত্তি, খ্যাতি— কোনোটাই জীবনের চুড়ান্ত চাহিদাপূরণ করতে পারে না। আমরা আসলে মরীচিকার পিছনে ছুটছি। মানুষে-মানুষে যে বিশ্বাসের বন্ধন হওয়া উচিত তা আমরা গড়ে তুলছি না, কিংবা যদি তেমন কোনও বন্ধন তৈরীও হয়, আমরা ঠুনকো স্বার্থের তাড়নায় সেই বন্ধনকেও ছিন্ন করছি এক লহমায়। জীবনের আরাধ্য “শান্তি” কি আমরা অর্জন করতে পারছি? না। প্রথাগত ইঁদুড়-দৌড় শেষে পড়ে থাকছে ভগ্ন স্বপ্ন, ভগ্ন শরীর, ভগ্ন মন, ভগ্ন সম্পর্ক, ভগ্ন মূল্যবোধ। অনেক পথ চলেছি, এবার দু-দণ্ড জিরোব।
ভিনসেন্টকে ছুটি দিয়েছি। সে দেশে ফিরে গেছে। আমিও নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়ব। হিমালয় আমাকে টানছে। সেখানকার নির্জনতা, নিস্তব্ধতা হয়ত আমাকে শান্তি দেবে। বরফে ঢাকা কোনও গুহার অনন্তশয্যায় ঘুমিয়ে পড়ব। আমার পাশে রাখা থাকবে আমার গবেষণা পত্র, আর আমার আবিস্কৃত শীতঘুমের ওষুধ। প্রকৃতি আমার শরীর অবিকৃত রাখবে। বহুবছর পর যদি কোনও পর্যটক আমার মৃতদেহ খুঁজে পায় তাহলে আমি আবার বেঁচে উঠব আমার আবিষ্কারের মাধ্যমেই।
বিদায় বন্ধু। ভাল থেকো।
ইতি তোমার ব্যর্থ গবেষক বন্ধু হরিশ।”
চিঠি শেষ করে খবরের কাগজের কাটিংটা খুললাম। বেশি পুরনো খবরের কাগজ নয়। প্রকাশের তারিখটা দেখা যাচ্ছে। আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম তখনই কাগজটা প্রকাশিত হয়েছিল।
খবরের কাগজের কাটিং-এ লেখা আছে, “এক জার্মান মহিলার গবেষণা পত্র বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ আগ্রহের সঞ্চার করেছে। এই গবেষণাপত্র অনুসারে এমন এক ওষুধ তৈরী সম্ভব যা খেলে মানুষের পক্ষে দৈনিক ঘন্টা খানেকের বেশি ঘুমের প্রয়োজন হবে না।”
বৈজ্ঞানিকের ছবিও রয়েছে সেই কাটিং-এ। বৈজ্ঞানিকের গলায় একটা মুক্তোর হার; হার থেকে ঝুলছে একটা লকেট। এই লকেট আমার চেনা।
বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়লাম। মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল মাত্র দুটো শব্দ, “ক্লোজড চ্যাপ্টার।”
0 মন্তব্যসমূহ