সুনীল জেঠু ভাল ছবি আঁকতে পারতেন। শিল্পী হিসেবে তাঁর নাম ডাকও হয়েছিল।
দেশভাগ হবার পর ওদেশ ছেড়ে যখন তিনি চলে এলেন তখন সঙ্গে করে কিছুই আনতে পারেননি। না পৈত্রিক সম্পত্তি, না স্ত্রী-কন্যা-- সবই কোথায় যেন হারিয়ে গেল। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেল ছবি আঁকার ইচ্ছেটাও। আনমনে তিনি শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
আমরা তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাবার জন্যে মাঝে মাঝে তাঁর হাতের কাছে ক্যানভাস-রং-তুলি এগিয়ে দিতাম। কিন্তু ওসব তিনি ছুঁয়েও দেখতেন না। বলতেন, 'ওই দ্যাখ, আকাশের ওই জায়গাটা দেখ, দেখেছিস মেঘ ওখানে কেমন সুন্দর একটা ছবি এঁকে রেখেছে? ঠিক যেন আমাদের সুরভী গাই। ওই দেখ তোদের জেঠি পুকুর থেকে কলসী ভরে জল নিয়ে আসছে। ওই পাশে লাল রঙের যে মেঘখণ্ডটা দেখছিস ওটা হল তোদের মালঞ্চদিদি— লাল ফ্রক পরে সাদা বিড়ালটা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।' সুনীলজেঠুর মুখটা প্রসন্নতায় ভরে উঠত। কিন্তু সেই প্রসন্নতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হত না। মেঘেরা স্থান পরিবর্তন করত প্রকৃতির স্বাভাবিক খেয়ালে। আর ছবিটাও যেত বদলে। উৎকণ্ঠিত হয়ে সুনীল জেঠু আর্তনাদ করে উঠতেন, "ওই দ্যাখ ওই দ্যাখ, সুরভীর মাথাটা ওর শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেল। কোনও এক ঈদের কয়েক দিন আগে আমাদের সুরভীগাই চুরি হয়ে গেছিল।' দূরের কালো মেঘখণ্ড দেখে জেঠুর মুখটা রাগে লাল হয়ে যেত মাঝে মাঝে। জেঠু চিৎকার করে বলে উঠতেন, 'শয়তানের দল— তোরা আবার এসেছিস? তোদের লোভ যায় না?'
বর্ষা কাল। আকাশে মেঘের খেলা চলতেই থাকত। কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে যেত। আকাশের সব ছবির উপরে যেন কালো কালি ঢেলে ছবিগুলোকে নষ্ট করে দিত কেউ। মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হত। জলের ধারা গড়িয়ে পড়ত সুনীল জেঠুর চোখ থেকেও। আনমনে তিনি ঘরের ভেতরে চলে যেতেন।
কখনো কখনো বাবা সুনীল জেঠুর উপর জোরাজোরি করতেন। 'পুরনো কথা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে? আবার ছবি আঁকাটা শুরু করো দাদা।'
জেঠু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, 'আমি কি আর মেঘের মত ছবি আঁকতে পারব? দেখিস না, ওরা যেমন চায় ঠিক তেমন ভাবে ছবি এঁকে নেয়। রাত পোহালে আমিও যখন মেঘের দেশে যাব তখন আমিও আবার ছবি আঁকা ধরব। নিজের মনের মত ছবি ফুটিয়ে তুলব আকাশে।'
এক শারদ প্রাতে সত্যিই সুনীল জেঠুর রাত পোহাল। মেঘের দেশে চলে গেলেন তিনি।
সেদিন বিকালে দেখলাম বাবা বিষন্ন মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। দুপুরে একপশলা বৃষ্টি হয়েছিল। ধূসরতা কাটিয়ে আকাশ পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘে সেজে উঠেছিল তারপরেই।
বাবা বললেন, 'দেখেছিস মেঘের দেশে গিয়ে তোদের জেঠুমণি কী সুন্দর একখানা ছবি এঁকেছে!'
ছবিখানা দেখে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আকাশে যেন পৃথীবির মানচিত্র ফুটে উঠেছে। সেই মানচিত্রে কোনও সীমান্তরেখা নেই, নেই কোনও কাঁটাতার, নেই সন্ত্রাসের কালো রঙও।
------------------------------
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

0 মন্তব্যসমূহ