Header Ads Widget

পলাতকা || প্রবীর মজুমদার

             

স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই শিবু মোদকের মোড়। এককালে এই মোড়ে একটা জনপ্রিয় মিষ্টির দোকান ছিল। দোকানীর নামানুসারেরে কালক্রমে মোড়টা শিবু মোদকের মোড় নামে পরিচিতি পায়। দোকানটা নেই বটে কিন্তু দোকানীর নামটা এখনো রয়ে গেছে! মোড়টাতে একটা রিক্সা স্ট্যান্ড আছে। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই এক রিকশাওয়ালা নান্টুদের পুরনো বাড়িটা দেখিয়ে দিল। মোড়ের পরের কানাগলির শেষ বাড়িটাই এলাকায় ঘোষবাড়ি নামে পরিচিত। রতন মাস্টার গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করার পর থেকে বাড়িটা খালি পড়ে আছে। তিনিই ওই বাড়ির অন্তিম ভাড়াটে। রতনবাবুকে না কী এই বাড়িতে মাঝে মাঝে দেখা যায়। এই গুজবের ফলেই বাড়িটার আর ভাড়াটে হল না। পরীক্ষায় নকল করে ধরা পড়ে এক ছাত্রী প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে রতনমাস্টারের নামে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছিল। তার ফলে অভিভাবক ও এলাকাবাসীদের অপমান ছাড়াও পুলিসি হ্যারাসমেন্টের শিকার হতে হয়েছিল রতনবাবুকে। সত্যিটা পরে প্রকাশ্যে এলেও অভিমানী রতনবাবু নিজেকে শেষ করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে বাড়িটা হানাবাড়ি হিসেবে পড়ে আছে। রতন মাস্টারের যৎকিঞ্চিত যা আসবাবপত্র ছিল দাবিদারের অভাবে সেগুলোরও সদগতি হয়নি। পড়ে আছে ওই বাড়িতেই।

আধমানুষ উঁচু পাঁচিলে ঘেরা রং-চটা সাবেককালের বাড়ি একখানা। মরচে পড়া গেটে তালা দেওয়া নেই। তালা থাকলেও অবশ্য সমস্যা হত না। এইটুকু পাঁচিল টপকানো রাতুলের পক্ষে কোনও ব্যাপারই নয়। প্রতিবেশীরা যদি অনধিকার প্রবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তাহলে আইডেন্টিটি কার্ড দেখাতে হবে, এই যা!

গেট ঠেলে বিনা বাধায় বাড়ির ভেতর ঢুকল রাতুল। দরজার পাশেই কলিংবেল। না, এখনই ডাকাডাকি করা ঠিক হবে না। আগে বাড়িটা সরেজমিনে দেখে নেওয়া ভাল। এই ধরণের পোড়োবাড়ি অনেক সময়েই সমাজবিরোধীদের আড্ডাখানা হয়ে ওঠে। তাই সাবধানের মার নেই। নান্টুকে খুঁজতে এসে সমাজবিরোধীদের শিকার হয়ে যাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রিস্ক না নেওয়াই ভাল।
অতিসাবধানে পা টিপে টিপে বাড়িটাকে একবার চক্কর মেরে তারপর কলিংবেলের সুইচে চাপ দিল রাতুল। দ্বিতীয়বার চাপ দেতে যাচ্ছিল, কিন্তু সামলে নিল। প্রথমবার সুইচে চাপ দেবার পর বাড়ির ভীতর থেকে কোনও শব্দ ভেসে আসেনি। লোডশেডিং হয়নি তো? না। ওই তো লাইটপোস্টে আলো জ্বলছে। আশেপাশের বাড়ির জানালা-দরজা থেকেও আলো চুঁইয়ে পড়ছে। তাহলে হয়তো ইলেকট্রিক কানেকশন কেটে দেওয়া হয়েছে। সেটার সম্ভাবনাই বেশি। নান্টুরা এই বাড়ি থেকে বাস উঠিয়েছে তাও অন্তত বছর দশেক। নান্টুরা আগে সোদপুর রেল স্টেশনের কাছেই ভাড়া বাড়িতে থাকত। বছর তিনেক হল নান্টু চাকরি পেয়েছে। কোয়ার্টার পাবার পর ভাড়াবাড়ি ছেড়ে নান্টুরা কোয়ার্টারে এসে উঠেছে— রাতুলের ঠিক পাশের ফ্ল্যাটই তাদের বর্তমান ঠিকানা।
এখনও দরজা ভীতর থেকে বন্ধ। ঘড়ির দিকে তাকাল রাতুল। মাত্র পাঁচটা বাজে। এর মধ্যেই আলো মরে আসছে। শীত কাল বলে তাড়াতাড়ি সন্ধ্যে নেমেছে। বিরক্ত হয়ে এবার রাতুল দরজার কড়া নাড়ল। না এবারও ভীতর থেকে কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।
কিন্তু হতোদ্যম হলে চলবে না। যার সন্ধানে সে এই বাড়িতে হানা দিয়েছে, তার সন্ধান এই বাড়ি থেকেই পাওয়া যাবে। বাড়িটার চারপাশটা তদন্ত করে দেখার সময় রাতুল বাড়িটার পিছনের বারান্দায় যে বাইকটাকে দেখেছে ওটা যে নান্টুর, নম্বর প্লেটই তা বলে দিয়েছে। কিন্তু নান্টুর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না কেন? তাহলে কি নান্টু মটকা মেরে আছে, না কি সাড়া দেবার পরিস্থিতিতে নেই? বাড়ির পেছনের দিকের দরজাটাও ভীতর থেকে বন্ধ, আবার সামনের দিকের দরজাও ভীতর থেকে বন্ধ। কেউ না কেউ তো বাড়ির ভীতরে আছেই। তাহলে কারো সাড়া নেই কেন? নান্টু এই বাড়িতে ঢুকে সুইসাইড করেনি তো? কথাটা মাথায় আসতেই আশঙ্কিত হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিল রাতুল। কাঁধ দিয়ে মুহুর্মুহু সজোরে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল সে। বেশ কয়েকবার ধাক্কা দেবার পর ভীতর থেকে ভারি কিছু পড়ে যাবার শব্দ পাওয়া গেল। তারপর অস্ফুট পদধ্বনি। কে যেন দরজার দিকে আসছে।

দরজা খুলে যেতেই রাতুল স্তম্ভিত হয়ে গেল। না, নান্টু নয়, এক নারী। যা সে অনুমান করেছিল তা-ই তাহলে ঠিক? সত্যি! নান্টু শোধরাল না! অবশ্য, নান্টুর আর দোষ কী? কামিনীর প্রলোভনে মুনি-ঋষিরা যেখানে টলে যায় সেখানে কনস্টেবল নান্টু ঘোষ কোন ছার! পতঙ্গ তো আগুনের দিকে ছুটে আসবেই। তবে, এই নারীর রূপ কতটা আগুনময়, পর্যাপ্ত আলোর অভাবে তা বোঝা গেল না। লাইট পোস্টের আলো যেটুকু আসছে তাতে আবছা ভাবে মহিলার আবয়ব দেখা যাচ্ছে। পোশাক অসংলগ্ন, যেন তার উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। দরজা খুলে সে দরজার পাল্লার উপর দেহভার রেখে ক্ষণিকের জন্যে নিস্তেজ হয়ে গেল। দুই পায়ের উপর যেন নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। পড়েই যেত যদি না মোক্ষম সময়ে রাতুল তাকে ধরে ফেলত।
জ্ঞান হারিয়েছে মহিলা। নান্টু কি মহিলার উপর অত্যাচার করেছে? কিন্তু ব্যাটার পাত্তা নেই কেন? বাইক ফেলে পালিয়েছে— তা হতেই পারে না। হয়ত কুকর্ম করে কুম্ভকর্ণের মত ঘুমাচ্ছে, নইলে খাবার-দাবার জোগাড়ের জন্যে বেরিয়েছে। দ্বিতীয় সম্ভাবনাই জোরদার।

মহিলাকে পাঁজাকোলা করে তুলে ঘরের ভীতরে পা রাখল রাতুল। ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। আলো জ্বালানো দরকার। মহিলাকে মেঝেতে নামিয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বেলে ঘরটাকে ভাল করে দেখল সে। ঘরে একটা তক্তপোষ। তার পাশে একটা ছোটো টেবিল। মেঝের উপর একটা ভাঙা কাঠের চেয়ার উলটে পড়ে আছে। মহিলা যখন দরজা খোলার জন্যে উঠেছিল তখন ধাক্কা লেগে এই চেয়ারটাই পড়ে গিয়েছিল বোধ হয়— সেই শব্দই পাওয়া গিয়েছিল কিছুক্ষণ আগে। টেবিলের উপর একটা খালি ১৮০ মিলি ওল্ড মঙ্ক, জলের বোতল একটা, আর খবরের কাগজে মোড়া কিছু পকোড়া। আর কিছু মোমবাতি।

রাতুল একটা মোমবাতি জ্বালল। মৃদু আলোয় ঘর ভরে গেল। মহিলাকে তুলে তক্তপোষে শুইয়ে দিল রাতুল।

মহিলা সদ্য যুবতী। সুন্দরী বললে কম বলা হয়। গৌরবর্ণ নির্মেদ শরীর, টিকালো নাক, পাতলা ঠোঁট লিপিস্টিক ছাড়াই লাল। কোনও প্রসাধনের লেশ নেই। পরনে সালোয়ার কামিজ। ওড়না শরীরে নেই। ওটা পড়ে আছে মেঝের উপর। কামিজের উর্ধাংশ খানিকটা ছিঁড়ে গেছে। যুবতীর উপর জবরদস্তি করা হয়েছিল বলেই মনে হল রাতুলের। তবে ধারণাটা কতদূর সত্যি তা জানা যাবে যুবতীর জ্ঞান ফেরার পরেই। তবে তার আগে বাড়ির অন্য ঘরগুলোকে দেখে নেওয়া দরকার।

প্রবেশদ্বার ছাড়াও এই ঘরের বাম দেওয়ালে আরেকটা দরজা আছে। সেই দরজা দিয়ে গেলে আরেকটা ঘর। সেই ঘরের সঙ্গে লাগোয়া রান্নাঘর, আর তার পাশ দিয়ে একটা সরু প্যাসেজ চলে গেছে। প্যাসেজের একপাশে মরচে পড়া গ্রিলে ঘেরা বারান্দা আর অন্য পাশে টয়লেট। এই বারান্দাতেই নান্টুর বাইকটা রাখা। অথচ নান্টুর কোনও পাত্তা নেই। ঘরের মেঝেতে জমা ধুলোয় অন্য কোনও পায়ের ছাপও নেই। তারমানে প্রথম ঘর ছাড়া অন্য ঘরগুলোয় কেউ আসেইনি। পেছনের বারান্দায় বাইক রেখে নান্টু মহিলাকে নিয়ে সামনের ঘরেই সময় কাটিয়েছে। ভীতরের ঘরে আর আসেনি। টয়লেটেও যায়নি।

রাতুল আবার প্রথম ঘরে ফিরে এল। মেয়েটা সেইভাবেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। প্রথমে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করা দরকার। তারপর সুশ্রুসা করে কিছুটা সুস্থ করে জেরা করতে হবে। পুরো ঘটনা না জানা পর্যন্ত পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত হবে। কেলেংকারী যদি কিছু ঘটেই থাকে তাকে ধামাচাপা দিতে হলে ঘটনার উপর একটা পরিস্কার ধারনা গড়ে তোলা দরকার।

রাতুল মেয়েটার চোখে মুখে জলের ছিঁটে দিল। ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এল মেয়েটার। জ্ঞান ফিরতেই অস্ফুট স্বরে সে বলল, ‘ও! ক্যা ঠান্ডি হ্যায়!'
মেয়েটার পরণে কোনও গরম পোশাক নেই। শীত লাগাটা স্বাভাবিক। অবশ্য জ্বরটরও হতে পারে। রাতুল মেয়েটার কপালে হাত ছোঁয়াল। ঠাণ্ডা। বরফের মত ঠাণ্ডা। মেয়েটা আবার জ্ঞান হারিয়েছে। নাহ্ জলের ছিটে দিয়ে কিছু হবে না। গরম দুধ ও ব্রান্ডির দরকার।
গরম পোশাকেরও দরকার। নিজের জ্যাকেটটা মেয়েটাকে পরিয়ে দিল রাতুল। আপাতত এছাড়া আর উপায় নেই। বাইরের থেকে ঘরটাকে আটকে বাজারে যাবার আগে নান্টুর বাইকের চাকার থেকে হাওয়া বের করে দিতে ভুলল না সে। নান্টু ফিরে এসে যদি মেয়েটাকে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করে, কিছুটা অন্ততঃ বেগ পাবে।

নাইট ডিউটি সেরে কোয়ার্টারে ফিরে সবে মাত্র একটু গা এলিয়ে দিয়েছিল রাতুল, এমন সময়, দরজার কলিংবেল বেজে উঠেছিল। বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দেখেছিল নান্টুর মা ঘোষকাকিমা দাঁড়িয়ে আছেন। চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ। তিনি জানিয়েছিলেন, রাতে নান্টু বাড়ি ফেরেনি। ফোন করলেও ফোন ধরছে না।
ঘোষকাকীমা বললেন, 'তুমি জানো নান্টু কোথায় গেছে? একটু খবর নিয়ে দেখো না বাবা!'
নান্টু যে থানার স্টাফ, রাতুল সেখানকারই সাব ইন্সপেক্টর। নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে রাতুল নান্টুর খবর নেওয়া শুরু করেছিল। জানা গেছে, গতকাল জীতেন্দ্র সিনেমা হলের সামনে নান্টুর ডিউটি পড়েছিল। ডিউটি শেষ হবার পর রিলিভারকে দায়িত্ব ছেড়ে সে সঠিক সময়েই অফডিউটি করে নিজস্ব বাইক নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু তারপরেই উধাও হয়ে গেছে। অত রাত্রে সে কোথায় যেতে পারে? তাও বাড়িতে না জানিয়ে! বাড়িতে অন্ততঃ ফোন করা উচিত ছিল না কি? রোড এক্সিডেন্টের কোনও খবর নেই, তাও রাতুল নিকটাবর্তী হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়েছিল। নিরাশ হতে হয়েছে। শেষে এক ইনফর্মারের থেকে জানা গেল, রেল কলোনির কাছে গতকাল রাতে এক মহিলা শিশুচোর ধরা পড়েছিল। জনতা উত্তমমধ্যম ধোলাই দেবার পর এক বাইকারোহী পুলিসকর্মীর হাতে তাকে তুলে দিয়েছিল। সেই পুলিস কর্মীর চেহারার বর্ণনা শুনে তাকে নান্টু বলেই অনুমান করেছিল রাতুল। নান্টুর নারী-লোলুপ মানসিকতা আছে। জনতা যাকে থানায় পৌঁছে দেবার জন্যে নান্টুর হাতে ছেড়েছিল, নান্টু তাকে থানাতে না এনে নিজের ভোগে লাগাবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? ষাঁড় টাইপের মানুষ তো! নারী-ঘটিত ব্যাপারে তাই নান্টুর সংযমের উপর কোনও ভরসা নেই রাতুলের। পরে নান্টুর মোবাইল ফোনের লোকেশন ট্রেস করে দেখা গেল সে চাকদহে আছে। চাকদহে যে নান্টুদের বাড়ি আছে তা জানা-ই ছিল। সেই সূত্র ধরেই রাতুলের এই অভিযান।

বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনে ফিরে আসতে আসতে মিনিট চল্লিশ লাগল। মেয়েটা তখন পাশ ফিরে শুয়ে আছে। অর্থাৎ জ্ঞান ফিরেছে। এখন ঘুমাচ্ছে। রাতুল তার মুখ ফাঁক করে সামান্য একটু ব্রান্ডি ঢেলে দিল। মেয়েটা চোখ খুলে একবার তাকিয়েই আবার চোখ বন্ধ করে নিল। অনেক কসরত করে দুধ-ব্রান্ডি গেলানোর পর মেয়েটা ধীরে ধীরে উঠে বসল। রাতুলকে দেখেই সচকিত হয়ে তক্তপোষের অন্যপ্রান্তে সরে গিয়ে দেওয়াল ঘেঁসে জড়োসড় হয়ে দুই হাত একত্রিত করে প্রাণপণে যৌবন আড়াল করার চেষ্টা করল। তার চাহনিতে আতঙ্কের চিহ্ন স্পষ্ট। মেঝে থেকে ওড়নাটাকে তুলে মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিয়ে রাতুল বলল, 'আপনার কোনও ভয় নেই। আপনি এখন নিরাপদ। আপনি আমাকে বলুন, আপনার সঙ্গে কী কী ঘটেছে।‘

মেয়েটা আর্তস্বরে বলল, 'মুঝে মত মারিয়ে! ম্যায় কুছ নেহি কিয়া।'

মেয়েটা হিন্দিভাষী। রাতুল তাই হিন্দিতেই কথা শুরু করল। বলল, ‘আপকো ড্যারনেকা কোই কারণ নেহি হ্যায়। আপ বিলকুল সুরক্ষিত হ্যায়। আপ মুঝে বাতাইয়ে , আপকে সাথ ক্যা ক্যা ঘটা হ্যায়। ম্যায় পোলিস হুঁ।‘
'পুলিস?' মেয়েটার গলা থেকে যেন অবিশ্বাসের সুর ভেসে এল। সেটা অস্বাভাবিক নয়। রাতুল সাধারণ পোশাকে ছিল, পুলিসের খাঁকি ইউনিফর্মে ছিল না। সেই কারণেই যেন রাতুলকে পুলিস হিসেবে মানতে পারছিল না মেয়েটা।
        রাতুল তাকে আশ্বস্ত করার জন্যে আইডেন্টিটি কার্ড দেখিয়ে বলল, ‘ম্যায় সাচমুচ হি পুলিস হুঁ। আপ মুঝে বিসওয়াস কর সাকতে হ্যায়।‘
'উও আদমিভি পুলিসকা পোশাক প্যাহেনা হুয়া থা। উও ক্যা সাচমুচ কা পুলিস নেহি থা?' কথাগুলো যেন স্বগতোক্তির মতই বিড়বিড় করে বলে গেল মেয়েটা।
রাতুল বলল, 'আপ কিসকে বারে মে বোল র‍্যাহে হ্যায়?'
'উও... উও আদমি যো মুঝে ইঁহা লেকে আয়া থা…'
        রাতুল মোবাইল ফোন বের করে নান্টুর ছবি দেখিয়ে বলল, ‘দেখিয়ে তো ইয়ে তসবির উস আদমিকা হ্যায় কি নেহি!’
মেয়েটার উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, 'হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ... ইস আদমি হি মেরে সাথ বুরা কাম কিয়া থা।'
রাতুলের সন্দেহ তাহলে নেহাতই অমূলক নয়। রক্ষকই ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। নান্টুকে মনে মনে অশ্লীল গালি দিয়ে রাতুল বলল, 'এই স্কাউন্ড্রেলগুলোর জন্যেই পুলিস ডিপার্টমেন্টের বদনাম হচ্ছে।'
‘আপ ক্যা জানতে হ্যায় ইস আদমি অব কাঁহা হ্যায়? আপকো উও কুচ বোলকে গ্যায়া হ্যায় ক্যা?'
        রাতুলের প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না মেয়েটা। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে এদিকে ওদিকে তাকাতে লাগল। সেই অসভ্য লোকটা ধারে কাছে নেই তো— এমনই এক আতঙ্কবোধ ফুটে উঠল তার চোখেমুখে।
না, আপাতত আর জেরা করা ঠিক হবে না। মেয়েটার মানসিক পরিস্থিতি ভাল নয়। বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে সম্পর্কটাকে আরেকটু ঘনিষ্ঠ করতে পারলে পুরো ঘটনা জানতে সুবিধা হবে। দীর্ঘসময় অভুক্ত থাকার ফলে মেয়েটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আপাতত তাকে কিছু খেতে দিতে হবে। বাজার থেকে দুই প্যাকেট বিরিয়ানি এনেছিল রাতুল। তার নিজেরও খিদে পেয়েছে। টেবিলে খাবার সাজানোর পর মেয়েটাকে খাবার জন্যে ডাকা লাগল না। সে নিজেই খাবারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কতদিন অভুক্ত কে জানে!

'আপকা নাম কেয়া হ্যায়?' রাতুল জিজ্ঞেস করল।
গোগ্রাসে বিরিয়ানী সাবাড় করতে করতে মেয়েটা জানাল তার নাম সাক্ষী।
'ঘর কিধার হ্যায়?'
'ধরমপুর।'
'বো কাঁহা হ্যায়?'
'হরিয়ানা।'
'ইধার ক্যা কর রহে হো? ইঁহা কোই রিস্তেদার হ্যায় ক্যা?'
'নেহি।'
'কাহা যানে কা থা?'
'মালুম নেহি।'
'ইধার ক্যায়সে আনা হুয়া?'
'ট্রেনমে চড়ি থি। ইসকে বাদ কুছ ইয়াদ নেহি।'
'টিকিট হ্যায় আপকে পাস?'
'নেহি।'
'আপ কাঁহা আ গ্যায়ে মালুম হ্যায়?'
'কাঁহা?'
'ইয়ে ওয়েস্ট বেঙ্গল হ্যায়। কলকাত্তাকা নাম শুনে হো? এ জাগাহ্ উসকা নসদিক হ্যায়। ঘরকা পাতা বাতাইয়ে, আপকো ঘর ভেজনে কা বন্দোবস্ত করনা হ্যায়।'
'নেহি...' ঘরে ফেরার কথা শুনে আঁতকে উঠল সাক্ষী, 'মুঝে ঘর মাত ভেজিয়ে। উও লোগ মুঝে মার ডালেঙ্গে।'
'কোউন লোগ?'
'গাঁও বালো।'
'কিঁউ?'
'উও লোগ বোলতে হ্যায়, মুঝপর পিশাচ কা ছায়া হ্যায়।'

সাক্ষীর অসংলগ্ন কথাবার্তা থেকে গোটা ঘটনার একটা আভাস পাওয়া গেল। হরিয়ানার প্রত্যন্ত একগ্রামে বাবা-মার সঙ্গে থাকত সাক্ষী। তার বাবা সচ্ছল কৃষক। ইদানিং তাদের গ্রামে কিছু শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে। অভিযোগের অঙুল ওঠে সাক্ষীর দিকে। গ্রামের গুণিন বলে সাক্ষীর উপর পিশাচ ভর করেছে। গ্রামের মাতব্বরেরা গুণধর গুণিনের পরামর্শে সাক্ষীকে পুড়িয়ে মারার ফতোয়া জারি করে। ফতোয়া কার্যকর করার জন্যে গ্রামবাসীরা যখন একরাতে মশাল নিয়ে সাক্ষীদের বাড়ি আক্রমণ করে তখন সাক্ষীর মা তাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। পিছিনে পিছনে তেড়ে আসে মাতব্বরদের দলবল। চলতে থাকে গুলি। সাক্ষীর মা লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে থাকে সাক্ষী। স্টেশনে পোঁছে দেখেছে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। তাতে উঠে পড়ার পর জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছে সে। জ্ঞান ফিরেছে রেলপুলিসের ডাকাডাকিতে। ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে বড় একটা ব্রিজ দিয়ে হেঁটে নদী পেরিয়েছে। সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরঘুর করে
ক্লান্ত হয়ে পথের পাশে একটা বাড়ির ছায়ায় বসে পড়েছে। খিদেতে তৃষ্ণাতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। সংগে টাকাকড়ি কিছু নেই যে কিছু কিনে খাবে। বাড়ি থেকে পালানোর সময় হাতে কানে গলায় কিছু স্বর্ণালঙ্কার ছিল। সম্ভবতঃ ট্রেনেই তা ছিনতাই হয়ে গেছে। রাস্তার পাশে বসে বসেই ধুকতে ধুকতে কখন যেন সে ঘুমিয়ে পড়েছে। ব্যস্ত শহর ফিরেও তাকায়নি। সূর্যাস্তের পর ঘুম ভেঙেছে। আবার পথ চলা শুরু হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় এসে দেখতে পেয়েছে ফুটপাতে ছেঁড়া মাদুরের উপর এক শিশু ঘুমাচ্ছে। পাছে সে হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তায় নেমে গাড়ি-চাপা পড়ে, তাই ভিখারিনী মা তার পা লাইট পোস্টের সঙ্গে বেঁধে রেখে রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তখন হঠাৎ কী যে হল, অকস্মাৎ সাক্ষীর মাথা ঘুরতে লাগল। তৃষ্ণাতে যেন ছাতি ফেটে যেতে লাগল। তারপর কী হল আর মনে নেই। জ্ঞান ফেরার পর হঠাৎ শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হতে লাগল। দেখল বেশ কিছু মহিলা ও পুরুষ তাকে বেঁধে মারছে। হঠাৎ এক খাকি পোশাক পরা লোক এসে পড়ায় প্রহার থামল। খাকি পোশাক পরা লোকটাকে জনতা কী সব নালিশ করতে লাগল। অনেক কথার মধ্যে "ছেলেধরা" শব্দটা তার অস্পষ্ট মনে পড়ছে। খাকি পোশাক পরা লোকটা সাক্ষীকে বাইকে বসতে বলল। লোকটাকে দেবদূত বলে মনে হল সাক্ষীর। সে নির্দিধায় বাইকে উঠল। বাইক ছুটে চলল। পথে কয়েকবার বাইক থামল। উর্দি পরা লোকটা দোকান থেকে কী কী সব কিনল, খাবার দাবারই হবে বোধহয়। শেষে বাইক এসে থামল এই বাড়ির সামনে।

সাক্ষীর জবানবন্দি শুনে রাতুলের পেশাদারি মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। হয়ত সে সঠিক অর্থে এখনও পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি। হয়ত অবিবাহিত বলেই অবচেতন মন নারীর প্রতি একটু বেশিই পক্ষপাতদুষ্ট। সাক্ষী যা যা বলল, তা অবিশ্বাস করার কারণ নেই। কারণ আমাদের দেশে এখনও ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারার মতন ঘটনা ঘটে। কুসংস্কারের বলি হয়েছে সাক্ষী। কিন্তু সমস্যা হল সাক্ষী তার বাড়ির ঠিকানা যথাযথভাবে বলতে পারেনি। সে পুরোপুরি মানসিকভারসাম্যহীন নয়, আবার মানসিক দিক থেকে পুরোপুরি সুস্থও নয়। সে যেন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। মানসিক কুয়াশা মাঝে মাঝে ফিকে হচ্ছে, আবার পরক্ষণেই গাঢ় হয়ে যাচ্ছে৷ সাক্ষীর মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন। তাকে এই ভাবে ছেড়ে দিলে নান্টুর মত শিয়াল-কুকুরেরা ছিঁড়ে খাবে। মানবিক দায়িত্বপালনের জন্যেই সাক্ষীকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রাতুল। নান্টুকে খুঁজতে এসে আচ্ছা ঝামেলার মধ্যেই পড়া গেল! তবে ছেলেধরা হিসেবে সাক্ষীর ধরা পড়ার ঘটনাটাকে গুরুত্ব দিলে সাক্ষীকে বেশ উঁচু দরের অভিনেত্রী হিসেবে সন্দেহ করা নেহাত অমূলক হবে না। সুতরাং সাক্ষী যা যা বলেছে তা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। এই কথা মনে হতেই রাতুল মোবাইল ফোনে সুকান্তবাবুকে কল করল। ভদ্রলোক একটা নামকরা দৈনিক সংবাদপত্রের সাব এডিটর।
সুকান্তবাবু নিরাশ করলেন না। তিনি মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই কলব্যাক করে জানালেন, হরিয়ানার এক গ্রামে জলাতঙ্ক রোগে কিছু শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দিন কয়েক আগে ডাইনি সন্দেহে এক মহিলাকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সেই মহিলা পালিয়ে গেছে। গ্রামবাসী ব্যর্থ হয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে সেই মহিলার বাবা-মাকে গুলি করে খুন করেছে। খুনিদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

খবরটা শুনে রাতুলের বুকের উপর থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল। সত্যি, মেয়েটাকে ছেলেধরা বলে মানতে মন চাইছিল না। এতক্ষণ একসাথে থেকে যেন তার উপর করুণা-ই জন্মে গেছে রাতুলের মনে। নান্টু যখন তখন ফিরে আসতে পারে। কী দরকার নান্টুকে ঘাঁটিয়ে? ব্যাটার কাজ হয়ে গেছে, ঠিক বাড়ি ফিরে যাবে। এই মুহূর্তে যদি সাক্ষীকে নিয়ে যায় সে, তাহলে ফিরে এসে যখন দেখবে শিকার ভেগেছে, তাহলে নান্টুর মুখের চেহারা কেমন হবে মনে মনে তা ভেবে বেশ পুলকিত হল রাতুল।

'সাক্ষী, মেরে সাথ যাওগী?' বলল রাতুল।
'কাঁহা?' নির্নিমেষে রাতুলের মুখের দিকে চাইল সাক্ষী।
'মেরা ঘর।' সাক্ষীর সবুজ চোখের দিকে চোখ রেখে বলল রাতুল। রাতুলের উদ্যেশ্য সাক্ষীকে ভুলিয়-ভালিয়ে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। অবশ্য সত্যি সত্যিই নিজের বাসায় নিয়ে গেলেই-বা ক্ষতি কী? কে বারণ করার আছে? তিনকূলে তো তার কেউ নেই। একা একাই জীবন অতিবাহিত করতে হয়। ভালবাসা পাবার সৌভাগ্য হয়নি। ভগবানই হয়ত এক অনাথার সঙ্গে অন্য অনাথের সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়েছে। এই সবুজ চোখে হারিয়ে গেলে মন্দ কী?
'যাওগী মেরে ঘর?' রাতুল পুনরায় জিজ্ঞেস করে।
'উস পোলিসবালাকে মাফিক তো নেহি ক্যারোগে?' শঙ্কা ঝরে পড়ে সাক্ষীর গলা থেকে।
'নেহি। ম্যায় আচ্ছা ইনসান হুঁ।' নিজেই নিজের শংসাপত্র দেয় রাতুল।
কিছুক্ষণ কী যেন ভাবে সাক্ষী। সহসা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না সে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের মাথে চেপে ধরে বসে পড়ে সে।

'ক্যা হুয়া?'
'চক্কর আ রাহা হ্যায়। পিয়াস লাগ রাহি হ্যায়। বহত পিয়াস।'
রাতুল জলের বোতল এগিয়ে দিতে গিয়ে দেখে বোতল খালি। সে বলল, 'তুম থোড়া বৈঠো সাক্ষী। ম্যায় পানি লেকে আতা হু। কহিঁ জানা নেহি।'
'পানিসে পিয়াস বুঝেগি নেহি। মুঝে তো কুছ অর হি চাহিয়ে।' অপলকে রাতুলের চোখে চোখ রাখল সাক্ষী। মেয়েদের মুখ থেকে এই রকম কথা শুনলে অন্য রকম অর্থ করতে ইচ্ছে হয়। সাক্ষীও কী অন্যরকম তৃষ্ণার কথা-ই বোঝতে চাইছে? সহসা বিহ্বল হয়ে পড়ল রাতুল। সাক্ষীর মুখে এখন আর কোনও যন্ত্রনার চিহ্ন নেই। সেখানে আলতো দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠেছে। চোখের সাদা অংশ লালচে বরণ ধারণ করেছে। সাক্ষীর বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ যে ইঙ্গিত করছে তেমনটা রাতুলের জীবনে এই প্রথম। আড়ষ্ট ভাবে বলল রাতুল, 'তুমহে ক্যা চাহিয়ে?'
'তুমকো।' সাক্ষী উঠে দাঁড়িয়ে সহসা রাতুলকে জড়িয়ে ধরল। নারী শরীরের প্রথম স্পর্শে শিহরিত হল রাতুল। তারপরেই গলার কাছে অনুভব করল সুতীব্র যন্ত্রণা। সাক্ষীর বাহুপাশ থেকে নিজেকে ছাড়াবার প্রবল চেষ্টা করল রাতুল। কিন্তু পারল না। অবলা নারী এখন আর অবলা নেই। চেতনা হারাবার আগে রাতুলের মনে পড়ল, কোনও একটা পত্রিকায় সে পড়েছিল, ভ্যাম্পায়ারের কামড়েও জলাতঙ্ক হতে পারে।

***

দিন কয়েক পর এলাকাবাসীর থেকে সন্দেহজনক দুর্গন্ধের অভিযোগ পেয়ে নান্টুদের পুরনো বাড়িতে পুলিস রেইড করল। দুটো মৃহদেহ পাওয়া গেল। একটা পড়েছিল ঘরের মেঝেতে, আরেকটা ছিল চৌকির তলে। দুটো মৃতদেহই ছিল রক্তহীন। দুটোরই গলার কাছে ছিল সূক্ষ্ণ দুটো ছিদ্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ