ফাটাফুটো মেঝের উপর কার্পেট পাতলে ঘরটাকে বেশ সুন্দর লাগে। কিন্তু কার্পেটের আড়ালে বিষাক্ত পোকার দাপাদাপি শুরু হলেই মানসিক শান্তি উধাও হয়ে যায়। আপনি যদি সেকুলার না হন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আপনি কার্পেট সরিয়ে পোকা মারার ব্যবস্থা করবেন, আর যদি সেকুলার হন তাহলে গৃহত্যাগ করার ক্ষণ গুনবেন। তোষণবাদের মত আত্মঘাতী প্রকল্প বারবার ব্যর্থ হবার পরও আমাদের শিক্ষা হয়নি, ভুলের পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছি। ঘর পরিস্কার করার কাজে আমাদের প্রধান বাধা ধর্মানুভুতিতে আঘাত-রোধী ঔপনিবেশিক আইন। আপনি যদি কুসংস্কার ও ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিরোধিতা করেন, ওই ধর্মানুভুতির আইন এসে শুধু আপনার চেপে ধরবে না, কুসংস্কার ও ধর্মীয়-সন্ত্রাসবাদীদের অন্যায় দাবি রক্ষা করার জন্যে আপনাকে জেলে ঢোকাবে। কিন্তু অন্যায় দাবিকে প্রশ্রয় দিয়ে কত দিন শান্তি রক্ষা করা যায়? কার্পেট ফুটো করে বিষাক্ত পোকা গুলো উঠে এসে কামড়াতে শুরু করলে ড্যামেজ কন্ট্রোল করার ক্ষমতা যে কারো-ই থাকে না, ইতিহাস তার প্রমাণ। আমাদের দেশে "ভাতের সমস্যা" র থেকেও বড় সমস্যা হল, ধর্মীয় সমস্যা, জাতিগত অসাম্য। দেশের সরকার নানা রকম প্রকল্প হাতে নিয়ে ভাতের সমস্যার সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করে বটে, কিন্তু ধর্ম ও জাতের মত মানসিক সমস্যার চিকিৎসার জন্যে কোনও পদক্ষেপই নেয় না। সংখ্যালঘুকে সন্তুষ্ট রাখাতেই সরকার মোক্ষ খোঁজে। সংখ্যাগুরুকে বঞ্চিত করে সংখ্যালঘুকে খুশি রাখলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে আরো বারোটা বাজে, তা যারা বুঝেও না বোঝার ভান করে তাদের হাতে দেশ কোনও মতেই সুরক্ষিত নয়৷ যে ধর্মনিরপেক্ষতা সংখ্যালঘুর অন্যায় দাবিকে সমর্থন করে, সেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার জন্যে যদি সংখ্যাগুরুদের মধ্যে দাবি ওঠে, তাহলে তাকে অনৈতিক বলা যায় কী করে? একদিকে সরকার নিজে প্রকৃত নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার জন্যে সার্বিক প্রচার করতে পারছে না, উল্টে "নুনুভূতি"র আইনের সাহায্যে চিন্তাবিদদেরও মগজে কারফিউ জারি করে রেখেছে। বাবাসাহেব আম্বেদকর১৯৪০ সালে তাঁর Pakistan or the partition on India বইতে ইসলামের যতটা সমালোচক করেছিলেন, তার সামান্যতম সমালোচনাতেও সরকার শিউরে উঠে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে জামিন অযোগ্য ধারায় লেখককে গ্রেফতার করে জেলে পুরে দেয়-- এমন ভাব করে যেন, সরকারের নিজের ধর্মানুভুতিতেই আঘাত লাগল! বাবাসাহেব যদি এখন বেঁচে থাকতেন তাহলে সম্প্রীতি রক্ষার অজুহাতে তাঁকেও যে IPC 295 (A) ধারায় জেলে পোরা হত না, তা ভাবার কোনও কারণ দেখি না। আসলে, ইসলামের সমালোচনা করার মত অপরাধ যে করে, সে যতই ভাল লোক হোক, সংখ্যালঘুকে তেল দেবার সুযোগ কী ছাড়তে আছে রে ভাই? এমনও অনুপ্রানিত রাজ্য আছে যেখানে সোসাল মিডিয়ায় শুয়োরের মাংসের ছবি পোস্ট করলেও জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেফতার করে জেলে পুরে দেওয়া হয়৷ তোষণের স্বার্থে যে এতটা নির্লজ্জ হওয়া যায়, তা বিশ্বাস করা কঠিন। বিশ্বাস করা কঠিন হলেও এটাই বাস্তব। এত স্পর্শকাতরতা কার পক্ষে মঙ্গলজনক? এই স্পর্শকাতরতাকে ভোটবৈতরণী পেরবার মোক্ষম উপায় বানিয়ে রাখা কিন্তু বেশিদিনের জন্যে সম্ভব হয় না। এত সহ্য করেও গান্ধীজি সন্তুষ্ট করতে পারলেন না, ছাগল-হারা হয়ে খালি হাতে নোয়াখালী থেকে ফিরতে বাধ্য হলেন, আর তুমি ভাবছ চিরিকাল ট্র্যাপিজের খেলা খেলে যাবে? তা কি হয়?
স্পর্শবাঁচিয়ে স্পর্শকাতরতা কমানো যায় না। তার জন্যে ফ্রেন্স দাওয়াইয়ের প্রয়োজন। কার্টুন দেখে গ্রাত্রদাহ হচ্ছে/চামড়া পুরু করো, নইলে ফোটো! বাজনা শুনে নুনুভূতিতে আঘাত লাগছে? সেখানে চলে যাও, যেখানে বাজনা বাজানো হারাম! কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? নুনুভূতি রক্ষার আইন যদি না থাকত তাহলে মুক্তচিন্তায় জোয়ার আসত। সেই জোয়ারে সমস্ত ধর্মীয় নুনুভূতিই ভেসে যেত। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা! ওই কালাকানুন থেকে মুক্তচিন্তকদের স্বাধীনতার সম্ভাবনা নেই। আসলে মুক্তচিন্তাতেই বেশিরভাগ শাসকের ভয়! অগত্যা ফ্রান্সকে দেখে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলা-ই আমাদের ভবিতব্য। আমরা নিজেরা কার্পেট সরাতে পারব না। সিনেমার টিপিক্যাল রাতকানা ওয়াচম্যানের মত সেকুলারিজম চিৎকার করে বলবে, "আল ইজ ওয়েল!" আর আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ব৷ সেই সাথে কার্পেটের আড়ালে ধর্মানুভুতি রক্ষার আইনের নিরাপত্তায় বিষাক্ত পোকার অবিরাম বংশবৃদ্ধি হতে থাকবে। তারপর একদিন কার্পেট ভেদ করে দলে দলে বাইরে বেরিয়ে এসে ওরা শ্লোগান দেবে, "মালাউন দূর হঠো"!

0 মন্তব্যসমূহ